ছেলেটির নাম রোকনুজ্জামান কল্লোল। আজকের গল্প এই কল্লোলকে নিয়ে।
কল্লোল সবেমাত্র বিসিএস ক্যাডারের কাস্টমস অফিসার হয়েছে। বুনিয়াদি ট্রেনিং শেষে ঢাকায় নতুন পোস্টিং। অফিসের ক্লার্ক ছেলেটির সাহায্যে দুদিনের মধ্যে একটি ছোট ফ্লাটও ভাড়া নিয়েছে কল্লোল। আর একটু গোছাতে পারলেই গ্রাম থেকে মাকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছে সে। কল্লোল নিজেই কোনরকম হাত পুড়িয়ে একবেলা রান্না করে। এছাড়া পাশের ফ্লাটের তাহেরা আন্টির কল্যাণে খাবারের কষ্ট নাই কল্লোলের। ১৪ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে রিমিকে নিয়ে তাহেরার সংসার। স্বামী চিটাগং নাকি কিসের ব্যবসা করে। তাহেরা আন্টি বেশ আন্তরিক। ১০/১২ দিনের মধ্যেই আন্টি ও আন্টির একমাত্র মেয়ে রিমির সাথে ভালো একটা সম্পর্ক তৈরি হলো। বাসায় তিন/চার পদ যা রান্না হয়, তাই আন্টি ট্রে সাজিয়ে কল্লোলের জন্য নিয়ে আসে। তাহেরাকে আন্টি ডাকার চেয়ে আপু ডাকতে ইজি মনে হয় কল্লোলের। মহিলার বয়স বোঝা যায় না। ৩২/৩৩ বছর বলে মনে হয়। তার উপর মারাত্মক সুন্দরী। তাহেরাই কল্লোলকে "আন্টি" বলে ডাকতে বলেছে। যাই হোক, আপু বা আন্টি একটা হলেই চলে কল্লোলের। তাহেরা সকালের নাস্তা, বিকেলে চা, রান্না করা বিভিন্ন তরকারি, ভর্তা পাঠাতেই থাকে । প্রথমে তাহেরা নিজেই ট্রে সাজিয়ে খাবার দিয়ে যেতো । পরে রিমি নিয়ে আসতো।রিমি অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। মায়ের সবটুকু সৌন্দর্য পেয়েছে রিমি। রিমি সামনে আসলেই মনে হয় একটা জীবন্ত গোলাপ দাঁড়িয়ে আছে। এই জীবন্ত গোলাপের দিকে তাকালে কেমন যেন মনে শান্তি শান্তি লাগে।
কয়েকদিন পরেই তাহেরা কল্লোলকে রিকোয়েষ্ট করলো - সে যেন রিমিকে একটু অংক শেখায়। রিমি অংকে খুব কাঁচা।
সত্যিই রিমি অংকে খুবই কাঁচা। মাথায় অংক কিচ্ছু ঢুকে না। স্কুলের স্যারের কাছে অন্য মেয়েদের সাথে ব্যাচে অংকের কোচিং করে। কিন্তু কি সব পাটিগণিত, বীজগণিত, ত্রিকোনমিতি আর ছাতার জ্যামিতি স্যার শেখায়, যা তার মাথার উপর দিয়ে যায়।
কল্লেল রাজি হয়। কখনো রিমিদের বাসার ডাইনিং টেবিলে, আবার কখনো রিমির পড়ার টেবিলে চলে অংক শেখা।
প্রতিদিন অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যায় কল্লোল রিমিকে অংক শেখাতে যায়। তাহেরা আদর করে কল্লোলকে বিভিন্ন ধরনের নাস্তা খাওয়ায়। তবে বেশিরভাগ সন্ধ্যাতে তাহেরা বাসায় থাকে না। বিভিন্ন কাজে সে বাইরে যায়।
এদিকে কল্লোল রিমিকে পাটিগণিত অংক শেখানোর সাথে ভালোবাসাও শেখাতে থাকে। সদ্য কৈশোরে পা দেওয়া রিমি বুঝতে পারে তার মা কল্ললকে খুবই পছন্দ করেছে। অতএব মায়ের প্রশ্রয় ও আগ্রহের কারনে রিমি কল্লোলের মাঝে হারিয়ে যেতে থাকে। এই প্রেম যখন অবাধ মেলামেশার পিচ্ছিল পথে দিশেহারা, তখন একদিন রাতে বাসায় ফিরেই তাহেরা কল্লোলকে বলে, তোমাকে অনেক ভরসা করে রিমিকে অংক শেখাতে দিয়েছিলাম আর তুমি কিনা রিমির সাথে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়ালে! শুধু যদি ভালোবাসতে তাও মেনে নিতাম। তুমি আমার কিশোরী মেয়ের সাথে শারীরিক সম্পর্কও স্থাপন করেছো!!
ঘটনা সত্যি। কল্লোল মাথা নিচু করে আছে। তাহেরা বললেন, "তুমি আজই রিমিকে বিয়ে করবা"।
কল্লোলের মাথা ঘুরছে। সেও রিমিকে ভালোবাসে। তবে এইভাবে হঠাৎ করে নিজের মায়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করা তার পক্ষে সম্ভব নয়। কল্লোল বলল, ' আমার পক্ষে এইভাবে এই বিয়ে করা সম্ভব নয়। আমার সময় লাগবে।'
ঘটনার বিহ্বলতায় রিমি আবেগপ্রবন হয়ে কান্নাকাটি শুরু করলো। কল্লোল তার প্রথম প্রেম। কল্লোলকে ভালোবেসে সে তার সবকিছু দিয়েছে। এখন কল্লোল যদি তাকে বিয়ে না করে, কল্লোলের মা যদি রাজি না হয়, তবে সে মরেই যাবে।
তাহেরার অনেক রাগারাগি, অনেক হুমকিতেও কোন কাজ হলো না। কল্লোল তার সিদ্ধান্তে অটল।
কোনোকিছুতেই কল্লোলের মন নরম হলো না। রেগেমেগে ও বিরক্ত হয়ে একমাস সময় লাগবে বলে সে রিমিদের ফ্লাট হতে চলে আসলো।
রিমি কাঁদতে কাঁদতে চোখমুখ ফুলিয়ে ফেলেছে। তাহেরা মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, কল্লোলের মা বিয়েতে রাজি না হলে হয়তো কল্লোল তোমাকে বিয়ে করবে না। তাই রিমি সোনা তুমি যদি কল্লোলকে বিয়ে করতে চাও, নিজের করে পেতে চাও, তবে তোমাকে একটা কাজ করতে হবে। তাহলেই কল্লোল তোমার হবে। তুমি কি করবে সেই কাজ??
কল্লোলকে পাবার জন্য রিমি সবকিছু করতে পারে। কল্লোলকে সে সত্যি সত্যি অনেক ভালোবাসে।
তাহেরা তখন বলল, তুমি এক্ষুনি আমার সাথে থানায় যাবে আর পুলিশের কাছে বলবে কল্লোল তোমার সাথে কি কি করেছে,,,
তাহেরা এলাকার ক্ষমতাধর তিনজন লোক নিয়ে থানায় গেলো। যেহেতু রিমি নাবালিকা, তাই তাহেরা নিজে বাদী হয়ে কল্লোলের বিরুদ্ধে রিমিকে ধর্ষণের অভিযোগে মামলা করলো।
এরপর বাকিটা ইতিহাস,,,
রিমির মেডিকেল হলো। রিমির জবানবন্দি নেয়া হলো। জবানবন্দিতে রিমি বলল, কল্লোল তাকে জোর করে কিছু করে নাই বা ধর্ষণ করে নাই। তাদের মধ্যে যা হয়েছে সবকিছু ভালবেসে হয়েছে।
এক্ষেত্রে রিমির বয়স যেহেতু কম, সেহেতু রিমির সাথে যা হয়েছে তা আইনে ধর্ষণ হিসাবেই বিবেচিত হবে। যতই তাতে রিমির মতামত থাকুক বা না থাকুক। এটা ধর্ষণই।
রাত চারটার সময় পুলিশ কল্লোলের দরজায় কড়া নাড়লো। দরজা খুলেই কল্লোল বুঝলো তাহেরার বিছানো ফাঁদে সে ধরা পড়ে গেছে।
পাশের ফ্লাট থেকে তাহেরা এবং তিন/চার জন লোক বের হয়ে এলো।
পুলিশ তো কল্লোলকে এরেস্ট করে নিয়ে যাবে। কল্লোল ভয় পেয়ে গেলো। তার নতুন চাকরি। জানাজানি হলে সে অবধারিত ভাবে সাসপেন্ড হবে। কল্লোলের সাথে কথাবার্তা বলে এক পর্যায়ে তাহেরাই পুলিশকে আশ্বস্ত করে জানালে যে, "আগামীকাল সকালেই কল্লোল কোর্টে গিয়ে সারেন্ডার করে জামিন নিবে। আর জিম্মাদার হবে তাহেরা। তবে তার আগেই কল্লোল রিমিকে বিয়ে করবে। অতএব পুলিশ অফিসারা যেন একটা দিন সময় তাদের দেয়"। এভাবেই আপাতত পুলিশকে ম্যানেজ করা হলো।
নিরুপায় কল্লোল সব মেনে নিলো।
এরপর পুলিশ বিদায় নিতে নিতে সকাল ৭টা। কিছুক্ষন পর বিয়ে পড়ানোর জন্য কাজী এলো। বিয়ে পড়ানোর সময় তাহেরা বলে দিল, দেনমোহর হবে ৫০ লক্ষ টাকা। কল্লোল একটু আপত্তি করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাহেরার কঠিন সিদ্ধান্তে তা চাপা পড়ে গেলো।
যাই হোক, ৫০ লক্ষ টাকা দেনমোহরে কল্লোল আর রিমির বিয়ে হয়ে গেলো। বিয়ের সময় কল্লোল আর রিমি দুজন দুই রুমে ছিল আর বিয়ের একটু পরেই তাহেরা কল্লোলকে নিয়ে দ্রুত রওনা দিল কোর্টের উদ্দেশ্যে। তাই বিয়ের পর রিমির সাথে কল্লোলের আর দেখা হলো না।
রিমি কল্লোলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো,,,
ঐদিনই সকাল ১০ টার সময় কোর্টে গিয়ে তাহেরা কল্লোলের জামিন করালো। জামিনের পর তাহেরা কল্লোলকে আর খুঁজে পায় নাই।
ছয় বছর সময় চলে গেছে। মামলাটি এখনোও চলমান। রিমি অনার্সে পড়ে। প্রতি মাসে কল্লোলের পক্ষ থেকে কেউ একজন রিমির নামে মানি ওর্ডার করে। তবে কল্লোল আর কখনোই রিমির সাথে কোন যোগাযোগ করে নাই। তাহেরাই বহুত ঝই-ঝামেলা করে কল্লোলের সাথে যোগাযোগ করতো। কল্লোল পরিষ্কার বুঝিয়ে দিয়েছিল, তাহেরা ও রিমির সাথে সে কোন সম্পর্ক রাখতে চায় না। তাহেরা কল্লোলের গ্রমের বাড়িতেও যায়। কিন্তু তেমন লাভ হয় না।
রিমিই কল্লোলকে কান্নাকাটি করে ফোন দিত, ম্যাসেজ দিত। কিন্তু কল্লোলের দিক থেকে ছিল নিরবতা।
রিমি বুঝে গিয়েছিল মায়ের কথামতো পুলিশের কাছে গিয়ে সে কল্লোলকে রাগিয়ে দিয়েছে। কল্লোলের সম্মানহানী হয়েছে। হারিয়ে ফেলেছে কল্লোলকে। রিমি নিজের মাকে রিকোয়েস্ট করতে লাগলো মামলা তুলে ফেলে কল্লোলকে মুক্তি দেয়ার জন্য।
কিন্তু তাহেরা তাতে গলবার পাত্র নয়। মামলা সে তুলবে না। রিমির কান্নাকাটি এবং পাগলাামীতে অতিষ্ঠ হয়ে তাহেরা আইনজীবীর মাধ্যমে বলল, আমি মামলা তুলবো, কল্লোল যেন দেনমোহরের ৫০ লক্ষ টাকা আগে দিয়ে দেয়।
কল্লোল রাজি হলো।
আজ সেই দিন। আজ তাহেরা আদালতে সাক্ষীর মাধ্যমে মামলা শেষ করেছে। তারপর আইনজীবী হিসাবে আমার চেম্বারে খোলা তালাক ও ৫০ লক্ষ টাকা বুঝে পাবার মাধ্যমে এই অসম্পূর্ণ সম্পর্কের অবসান হবে।
রিমি ভেতরের রুমে বসে আছে। অন্য রুমে বসে কল্লোল ও কল্লোলের পক্ষের লোকেরা তাহেরার হাতে নগদ ৫০ লক্ষ টাকা বুঝায়ে দিয়েছে। কাজী সাহেবও উপস্থিত আছেন খোলা তালাক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করাতে।
আমি রিমিকে ডাকতে গিয়ে দেখি রিমি খুব কাঁদছে। ওর মাথায় হাত রাখতেই রিমি বড়বড় চোখ ভর্তি পানি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, "সিগনেচারের আগে কল্লোল যেন তাকে পাঁচ মিনিট সময় দেয়।"
আমি অবাক হয়ে বললাম, এ আবার কেমন আবদার! কিন্তু রিমি নাছোরবান্দা। বাধ্য হয়ে কল্লোলকে বললাম, রিমি আপনাকে একা কিছু বলবে, তারপর ডিভোর্সে সিগনেচার করবে।
প্রথমে কল্লোল ভয় পেয়ে এবং বিরক্ত হয়ে আপত্তি করলো। তাহেরাও আপত্তি করলো।
আমি তাদেরকে আশ্বস্ত করে বললাম, "আমি থাকবো সাথে, ভয় পাবার কিছু নেই। একটু পরেই তো চিরকালের মত সব সম্পর্ক শেষ হয়ে যাবে। মেয়েটা কি বলতে চায় শুনলে তেমন ক্ষতি হবে না আশা করি।"
অবশেষে কল্লোল রিমির সাথে কথা বলতে রাজি হলো। চেম্বারের আর সবাই বাইরে বের হয়ে গেল।
কল্লোলকে ভেতরের রুমে রিমির কাছে নিয়ে গেলাম। রিমি বসেছিলো। কল্ললকে দেখে উঠে দাড়ালো। সালাম দিল।
কল্লোল কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলো, 'ছয় বছর ধরে চলা এই সম্পর্কের টানাপোড়েন এখন শেষ হবার পথে,,, এই শেষ সময়ে পাঁচ মিনিট সময় দিয়ে কি করবা!'
ধরা গলায় রিমি বলল, "আপনার সাথে আমার সব স্মৃতিই ছোট বয়সের, বিয়ের আগের- যখন আপনি আমার হাসবেন্ড ছিলেন না। বিয়ের পর আপনাকে আমি এক মূহুর্তের জন্যও দেখি নাই। কোনো কথা বলতে পারি নাই। তাই হাসবেন্ড হিসাবে আপনার সাথে আমার কোন স্মৃতি নাই। আজকের এই পরিস্থিতির জন্য হয়তো আমরা প্রত্যেকেই দায়ী। আপনি যদি আমাকে নিয়ে সংসার করতেন, ভালোবাসতেন তবে বিয়ের আগের ঐসব ভালোবাসার স্মৃতি অনেক সুন্দর মনে হতো। কিন্তু আপনি তো আমাকে মেনেই নেন নাই। তাই ওগুলোকে নোংরা মনে হয়। এত্তো
কিছুর পরও আপনি তো আমার হাসবেন্ড, ডিভোর্স হলেও আপনি আমার হাসবেন্ড। আমি আমার হাসবেন্ডকে নিয়ে ভালো কোন স্মৃতি রাখতে চাই, আপনাকে কাছ থেকে দেখতে চাই। এক টেবিলে বসে দুজনে একবার চা খেতে চাই,,,
আমার কেন যেন মনে হলো- কল্লোলের কঠিন মুখটা খানিকটা নরম, কোমল, আর কেমন যেন দিশেহারা দেখাচ্ছে।
কল্লোলকে রিমির পাশে রেখে আমি বাইরে বের হয়ে এলাম। জানি, সম্ভব না। তাও মনে মনে প্রার্থনা করতে লাগলাম, হে বিধাতা, কোনো ম্যাজিক করো। এই আল্প বয়সী মেয়েটি যেন কল্লোলকে নিয়ে পাঁচ মিনিট নয়, পঞ্চাশ বছরের সুন্দর স্মৃতি নিয়ে বাঁচে। ম্যাজিক করো বিধাতা। ম্যাজিক করো,,,
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন