রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'ডাকঘর' নাটকটির প্রধান চরিত্র 'অমল'। এক অজানা রোগে অমল আক্রান্ত। কবিরাজ তাকে ঘরের বাইরে যেতে নিষেধ করেছে। দুরন্ত, চঞ্চল শিশু মন ঘরে বসে থাকতে চায় না। অথচ তাকে ঘরেই থাকতে হয়। তাই সে রাস্তার ধারের জানালার পাশে সারাদিন বসে থাকে। সেখানে বসে সে কখনো দইওয়ালা, কখনো প্রহরী, কখনো গ্রামের মোড়ল বা কখনো ফুল তুলতে যাওয়া মালিনীর মেয়ে সুধা আবার কখনো দূরের গ্রামের ছেলেদের সাথে কথা বলে। কল্পনায় সে নিজেকে সেইসব জায়গায় নিয়ে যায়, সেইসব চরিত্রে মিশে যায়। শারীরিক সীমাবদ্ধতা, ক্লান্তি ও অসহায়তার মধ্যেও তার দুরন্ত, চঞ্চল কিশোর মনটি রঙ-বেরঙ এর বিভিন্ন মানুষের সাথে কেমন দেশ-বিদেশে ছুটে বেড়ায়,,,!!
অমলের সেই জানালাটা ২০২১ সালেও আছে। আছে অসংখ্য অমল,,,,
তবে ঐ জানালাতে এখন আর নেই কোন লোহার শিক বা গ্রিল। এখন জানালাতে লাগানো আছে 'গরিলা' বা 'কম্বো' প্রটেক্টর গ্লাস। গ্লাসের ঐ পাড়ে আছে রঙিন আলোক ঝলমলে দুনিয়া। কিন্তু এই রঙিন দুনিয়াতে নেই রক্তমাংসের কোন দইওয়ালা, প্রহরী, গ্রামের মোড়ল, মালিনীর মেয়ে সুধা বা দূর গ্রামের ছেলেরা। এখনকার বাচ্চারা মানবিক লেনাদেনা শেখে বই পড়ে। বন্ধুর জন্মদিনে উপহার দেয় ভার্চুয়াল কেক,,,
করোনা ভাইরাসের আক্রমণ ঠেকাতে বাচ্চাদের জন্য গত দেড় বছর তাদের স্কুল, খেলার মাঠ সব বন্ধ। ঘরের চার দেয়ালের সীমাবদ্ধতা, একঘেয়ে ভাব ও অসহায়তার মধ্যে এখনকার বাচ্চাদের দুরন্ত, চঞ্চল মনটি কেবলমাত্র মোবাইলের স্কিনের ভেতর দিয়ে ভার্চুয়াল জগতের রঙিন আলোয় ও নানান গেমসের মাধ্যমে কেমন যেন দেশবিদেশে ছুটে বেড়ায়। অর্থাৎ একশ দশ বছর আগের রবীন্দ্রনাথের 'অমল' রয়েছে প্রত্যেকটা ঘরে ঘরে,,,
প্রযুক্তির উন্নতি ও করোনা ভাইরাসের বদৌলতে বর্তমানে মধ্যবিত্ত রক্ষণশীল পরিবারের স্কুল পড়ুয়া বাচ্চাটাও নামে বা বে
নামে মোটামুটি একটা এন্ড্রয়েড ফোন সেটে
মালিক। আর আমি আপনি!!! এটা ছাড়াতো টয়লেটও যেতে পারি না!!!! তবে এই এন্ড্রয়েড ফোন ও ইন্টারনেট কিন্তু আজ গোটা পৃথিবীটাকেই যেন হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। এই ভার্চুয়াল জগতের সুবিধা নতুন করে বর্ণনার কিছু নেই,,,,
কোন কিছু জানতে চান, বুঝতে চান বা করতে চান,,,,,,,,,,,,রান্না, চাকরি, মেশিন পরিষ্কার, চুল কাটা, মাছধরা, ভ্রমন, ডাক্তারি, ওকালতি, সেবা, খেলা, মুভি, পর্নগ্রাফি, পন্য বিক্রি, মাদক, বই, অস্ত্র, ইতিহাস, ব্লগ তৈরি ও তার দিয়ে আয়-ইনকাম করা- কি নেই এই ইন্টারনেটে !!!!! জীবনের জন্য যা যা চান- সব পাবেন। এ ক্ষেত্রে আপনার ইচ্ছেটা রাজি হলেই হলো। জানালার ঐ পাশের সবকিছু নির্ভর করছে আপনার মন, শিক্ষা, রুচি, আগ্রহ, আসক্তি ও সামর্থ্যের উপর!!!--- সব পেয়ে যাবেন আঙ্গুলের টোকায়। অনেকটাই আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপের মতো,,,,এই ভার্চুয়াল জগত এখন এক বিশাল তথ্য ভাণ্ডারে পরিণত হয়েছে, যেখান থেকে যে কেউ তার কাঙ্ক্ষিত যে কোন তথ্য সংগ্রহ করতে পারে। আর ভার্চুয়াল জগতের সুবিধা হলো- বিশ্বের যে কোনো স্থান থেকে যে কোনো সময় এর সেবা নেওয়া যায়।
ইন্টারনেটের কারণে চোখের সামনে খুলে যাচ্ছে অজানা বিস্ময়, না-দেখা নতুন জগৎ। আর নতুনের প্রতি আকর্ষণের ফলে ইন্টারনেটে অতি মাত্রায় আসক্তি বাড়ছে সকলের। শিশুরা বড়দের দেখে অনেক কিছু শেখে। বড়দের আচার-আচরণ, কথাবার্তা ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ধরন ছোটদের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। এ কারণে বাচ্চাদেরকে ইন্টারনেটের সুস্থ ও সদ্ব্যবহার শেখাতে এবং এর আসক্তি থেকে মুক্ত রাখতে হলে বড়দেরকেই আগে সতর্ক হতে হবে,,,,,
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শিশুদের মধ্যে মাদকাসক্তির মতো ইন্টারনেট আসক্তিও ভয়াবহ আকারে ছড়িয়ে পড়ছে। কারণ, শিশুদের সঠিকভাবে ইন্টারনেট ব্যবহারের শিক্ষা না দিয়েই তাদের হাতে ইন্টারনেট তুলে দেওয়া হচ্ছে। ভার্চুয়াল জগতের নিষিদ্ধ বিষয় ও অন্ধকার অলি গলি গুলো এত সহজলভ্য যে, তারা সহজেই তাতে প্রবেশ করতে পারছে। আর তাতে করে কেউ কেউ সেই ধাক্কা সামলাতে পারছে না।
"আমি আমার ফোনে ইন্টারনেটের ফেসবুক ছাড়া অন্য কিছু ব্যবহার করি না বা বাচ্চাদেরও করতে দেই না"---এটা বলে গো ধরে বসে থাকার কিছু নেই। আগে শিখুন, এর ব্যাপকতা সম্পর্কে জানুন, জ্ঞান বাড়ান; এরপর নিজে সঠিকভাবে ব্যবহার করুন। তারপর বাচ্চাদেরকে এই জগতের সঠিক-বেঠিক পথগুলো সম্পর্কে বলুন ও ব্যবহার করতে দিন।
আপনি কী মনে করেন- নেট চালাতে না দিলে বা এডাল্ট চ্যানেলে ঢুকতে না দিলে বাচ্চা কিছু জানবে না? বাচ্চা ঠিকই জানবে! তবে সেটা আপনাকে গোপন করবে! আর ভুলভাবে জানবে। আপনি শেখালে হয়ত ভুল বা ক্ষতিকারকটা শিখতো না। ওরা তো নিজেদের মতো করেই শিখে নেয়। এমন কি গেমের মধ্যেই কত কিছু কতভাবে শিখে নেয়!!
তাই বাবা-মায়েরই উচিত ইন্টারনেট ব্যবহারের সুফল ও কুফল নিয়ে নিজের সন্তানদের সাথে আলোচনার করা। সঠিক নির্দেশনা দেয়া,,,,
শুধু তাই নয়, সঠিক ইন্টারনেট শিক্ষার পাশাপাশি আপনি আপনার কিশোর সন্তানটিকে শেখাবেন- ছেলে ও মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তন, বয়ো: সন্ধিকাল, প্রজনন, বৈধ সম্পর্ক, অবৈধ সম্পর্ক এবং এই সম্পর্কের সুফল-কুফল ও গভীরতা, কীভাবে নিজেকে রক্ষা করতে হয় বা কতটুকু বন্ধুত্ব করা উচিত, বয়সের আবেগ, সংযম ও সময়,পারিবারিক পজিটিভ মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন, পরিচ্ছন্ন ব্যক্তিত্ব, সংযত হবার শিক্ষা, লাগাম টানার কৌশল ইত্যাদি,,, তাতে ভার্চুয়াল জগতের নিষিদ্ধ বিষয়গুলো সম্পর্কে জানলেও হোঁচট খাবে না। কিছুটা হলেও ভালো-মন্দ নির্বাচনের বুঝ আসবে।
কি ভাবছেন- আপনার কচি সন্তানটি এই বয়সে সব জেনে যাবে? তাতে সে আরো খারাপ হয়ে যাবে? না, তা হবে না হয়ত, যদি আপনি সঠিকভাবে ও বন্ধুর মতন করে সন্তানকে বোঝাতে পারেন। কিন্তু আপনি পারবেন তো আপনার সন্তানকে বোঝাতে? রক্ষণশীল সমাজ কাঠামো ও পরিবার ব্যবস্থায় এবং ধর্মীয় অনুশাসনে বেড়ে ওঠা আপনার পক্ষে নিজ সন্তানের সাথে এই বিষয়ে আলোচনা করা অবশ্যই কঠিন বিষয়! সন্তানের সামনে সহজ আচরণ করা খুব টাফ হয়ে যায়!
তারপরও,,,একবার ভাবুন তো,,,,,, আপনার সন্তান কিন্তু সব জানবেই। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। তবে তা হয়তো ভুল ভাবে, ভুল সময়ে, ভুল প্রয়োগে, ভুল মানুষের কাছ থেকে,,,
এতো স্পর্শকাতর একটা বিষয়ে আপনার সন্তানের জন্য আপনার থেকে ভালো শিক্ষক আর কেউ কি হতে পারে!!!! অতএব এই গুরু দায়িত্বটা সময় থাকতে আপনাকেই পালন করতে হবে। এটাই সময়ের দাবী,,,,,
এই জেনারেশনের বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে প্রচন্ড গতিশীলতা। এদের কালচারও আপনার থেকে আলাদা। তাই ওদের লাগাম টানাও কঠিন। তারপরও ওদেরকে বুঝতে চাইলে ও বোঝাতে চাইলে ওদের গতির সাথে পাল্লা দিতে হবে। আমাদের চেষ্টা থাকবে যাতে করে নতুন ডিভাইস, নতুন থিম, নতুন কিছুর ভালোটুকু যেন ওরা নেয় আর খারাপটা বাদ দেয়। ভালো-মন্দ তো থাকবেই। মন্দটা না থাকলে ভালোটা শিখবে কিভাবে! আমি বিশ্বাস করি- ভালো মন্দের মিশেল না থাকলে balance থাকে না।
তাই জানালা বন্ধ করে নয়; জানালা খুলেই সন্তানকে ডাক দিন। সন্তানদের বেছে নিতে সাহায্য করুন রঙিন ও হেভবি স্পিডি "ফাইভ জী" দুনিয়ার ভালো দিকগুলো,,,,,,



কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন