১৯৯৪ সালে SSC পাশের পর রাজবাড়ী সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজে ভর্তি হলাম। ক্লাস শুরু হলে দেখি দুজন ম্যাডাম বাংলা পড়ায়। পরিচয় পর্ব থেকে জানলাম অপেক্ষাকৃত কম বয়সী খুবই মিষ্টি চেহারার ম্যাডামের নাম তাহিরা হাসান কাজল, আমাদের কাজল আপা। উনি যখন লেকচার দিতেন তখন ক্লাসে কোন গল্প করা বা অমনোযোগী হওয়া চলবে না।
আর আমরাও মাত্র স্কুল থেকে আসা ছটফটে, বেপরোয়া ছাত্রী, ম্যাডামের লেকচারে কোন মনোযোগ দিতে চাইতাম না। ম্যাডামও লেকচারে মনোযোগ দেয়ার জন্য কঠিন স্টিমরুলার চালাতেন। ম্যাডাম পড়ানো শুরু করেছিলেন "মেঘনাদ বধ"কাব্যের অংশবিশেষ "সমুদ্রের প্রতি রাবণ" দিয়ে। আমি ভাবলাম,,, ওহ!!!! এই গল্প!! রাবণ সীতাকে অপহরণ করেছিল আর রাম-লক্ষ্মণ রাবণের স্বর্নলঙ্কা ধ্বংস করে সীতাকে উদ্ধার করেছিল --- সেই গল্প!! এটা আবার কে না জানে!!!
দশমাথার অসীম শক্তিধর রাবণের গল্প কম-বেশি সবাই জানি। রামায়ণ যারা পড়েছেন, তারা বেশ ভালো করেই জানেন- রাবণ একজন অত্যাচারী ও ধর্ষক হিসেবে বিশেষ খ্যাত হয়ে আছেন মহাকাব্যের পাতায় পাতায়।
ম্যাডাম পড়াচ্ছেন "মেঘনাদ বধ কাব্য" !!!! কিন্তু আমি অবাক হয়ে শুনলাম- এই গল্প পিচাশ রাবণের নয়। মায়া-মমতায় ভরা এক মানবিক রাবণের গল্প!!!!
মর্তের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী দশানন রাবণ- যিনি দুই হাতে হিমালয়ের কৈলাশ পর্বত তুলে ফেলেছিলেন। অথচ এক বছরেরও অধিক কাল সীতা রাবণের কুক্ষিগত থাকলেও তিনি সীতার সম্ভ্রমহানি করেননি। নিজের স্বর্নের তৈরি সাম্রাজ্য ধ্বংসের জন্য কষ্ট, ভয়ংকর উত্তাল সমুদ্র রামের বশ্যতা স্বীকার করায় আশাহত, নিজ ভায়ের বিশ্বাসঘাতকতায় জর্জরিত, পুত্রশোকে বিহ্বল রাবণের গল্প!!!!
বিমোহিত, মুগ্ধ আমি!!! কি চমৎকার বর্ণনা। মাইকেলের লেখা কবিতা আর ম্যাডামের বর্ণনায় বর্বর রাবণের জন্যও মায়া লাগতে লাগলো!!!!
ঐ দিন থেকে আর কখনোই ম্যাডামের ক্লাস মিস করিনি। সামনের বেঞ্চে বসতাম শুধুমাত্র তার লেকচার শুনবার জন্য, বুঝবার জন্য।
"অধিকার ছাড়িয়া দিয়া তা দেখাইবার মতো এমন বিড়ম্বনা আর নাই " এই কঠিন লাইনটা রবীন্দ্রনাথের "হৈমন্তী" গল্পের। আপা 'হৈমন্তী' গল্প পড়ানোর সময় এই কঠিন লাইনটা খুবই সুন্দর ও সহজভাবে বুঝিয়েছিলেন। 'হৈমন্তী' পড়াতে পড়াতে ম্যাডাম আরো বলেছিলেন- "ভালোবাসতে হয় ছেড়ে দিয়ে, বেধে রেখে নয়"। কি চমৎকার বর্ণনা, শব্দ চয়ন , উচ্চারণ, কথার পিঠে কথার গাঁথুনি যেন গল্পের মধ্যে আরেক গল্প।
মনে হচ্ছে- এই তো সেদিনের কথা!!!! চোখের সামনে একেএকে ভেসে উঠছে,,,,,হৈচৈ, ক্লাস রুম, কাজল আপা আর আমরা,,,
আপার চোখে একটা ম্যাজিক ছিল। তাকালেই মনে হতো, উনি চোখ দিয়ে হাসছেন,,,,,,,
খুবই সিম্পল সাজে, পরিপাটি শাড়ি পরে, একগাল হাসি নিয়ে একেবারে সাধারণের অসাধারণ কাজল আপার উপস্থিতিতে যেন চারপাশ আলোকিত হয়ে উঠতো। ম্যাডামের কাছে পড়া, বিভিন্ন গল্প শোনা, আজাদ স্যারের সাথে বিয়ে নিয়ে আনন্দ করা, দুজনেরই গায়ে হলুদে মজা করা, তাদের বিয়ের অনুষ্ঠানে হৈচৈ আনন্দ করা,,,,,, এছাড়া পরবর্তীতে রাজবাড়ীর বিভিন্ন প্রোগ্রামে তাকে খুব কাছ থেকে পেয়েছি- এটা আমার পরম সৌভাগ্য। আমার চরম দুঃসময়ে তিনি আমার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, "আমার হাত শক্ত করে ধর। দেখি এবার তুই কেমনে পড়ে যাস!!!!!"
কেন আমাকে এতো ভালোবেসেছেন আপা; তা জানিনা। হয়তো উনার ভালোবাসার ধরনটাই ছিল এমন শক্তিশালী!!!!
মনে হচ্ছে খুবই অল্প সময় আপাকে পেলাম!
হুমায়ুন আহমেদ অনেক বার বলেছেন, তুচ্ছ কচ্ছপ ৪০০ বছর বাঁচে কিন্তু মানুষের জীবন কেন এতো ছোট!তেমনি আমাদের কাজল ম্যাডাম,,,!!
তবে সব মৃত্যুই মৃত্যু নয়।
কাজল ম্যাডাম মৃত্যর পরেও আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন।
পরম করুনাময় আল্লাহ উনাকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসীব করুন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন