তন্ময়রা দুই ভাই এক বোন। সে গাজীপুর গভমেন্ট বয়েজে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ে। ছোট ভাইটি সপ্তম শ্রেণীতে আর বোনটি পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ে।
তন্ময়ের বাবা হেলাল সাহেব একজন অ্যাডভোকেট। সিভিল প্রাকটিশনার হিসাবে গাজীপুর বারে তিনার বেশ সুনাম আছে। আইনকে ভালোবেসে এই পেশায় এসেছিলেন এবং এখন পর্যন্ত আইনই তার ধ্যান জ্ঞান। টাকার পেছনে ছুটেন নাই কখনো। গাজীপুর বারে বর্তমানে উকিলের ছড়াছড়ি। তাই সুনাম থাকলেও খুব বেশি মামলা মকদ্দমা হেলাল সাহেবের নাই। এরপরও যে কয়েকটি মামলা মকদ্দমা তিনার ছিল তা দিয়ে তিনি ভালোভাবেই জীবিকা নির্বাহ করছিলেন। কিন্তু ২০২০ সাল থেকে করোনা ভাইরাস এর কারণে আদালত বন্ধ, সিভিল কোর্ট গুলোর অচল অবস্থা। তাই হেলাল সাহেব খুব অর্থ কষ্টে আছেন। আজ গল্প বলছি তন্ময়ের বাবা অ্যাডভোকেট হেলাল সাহেবের,,,,,,,,
প্রতি বছর দুই ছেলেকে সাথে করে নিয়ে দিন দশেক আগেই হাটে যেয়ে কোরবানি দেয়ার জন্য পছন্দসই পশু কিনে আনেন হেলাল সাহেব। কিন্তু গত বছর থেকেই করোনার ধাক্কায় জর্জরিত উকিল সম্প্রদায়, তাই গত বছর কোরবানি দিতে পারেন নি তিনি। বাচ্চারা খুবই মন খারাপ করেছিল। এইবার তিনি কোরবানি উপলক্ষে একটি ছাগল এনেছেন কোরবানির সাত দিন আগেই। তন্ময়রা তিন ভাই-বোন অতি উৎসাহে আম পাতা, কাঁঠাল পাতা খাওয়াচ্ছে ছাগলটাকে। ছাগলটা থাকায় বাড়িতে বেশ একটা ঈদের আমেজ আছে। তন্ময়রা আনন্দে আছে। তাদের বন্ধু বান্ধবরা এসে কোরবানির ছাগল দেখে যাচ্ছে। তন্ময়রাও যাচ্ছে বন্ধু বান্ধবদের বাড়িতে তাদের কোরবানির গরু কিংবা ছাগল দেখতে। কোরবানির ঈদের মজাই তো পশু কেনাকাটা ও কোরবানিতে। শুধুমাত্র তন্ময়ের মা চিন্তিত। তিনি বাচ্চাদের সাথে আনন্দ করতে পারছেন না। নিচু গলায় স্বামীকে শাসাচ্ছেন, "শুধু ছাগল কিনলেই হবে; রান্নার মসলা, দুধ, চিনি, সেমাই কেনার পয়সা কোথায়,,, "
যাইহোক ঈদের দিন সকালে তন্ময়রা বেশ আনন্দ করে নিজেদের গোসলের আগে ছাগলটাকে গোসল করালো। বাবার সাথে ঈদগাহে গিয়ে নামাজ পড়লো। নামাজ শেষে বাড়ি ফিরে বাবাকে জিজ্ঞেস করলো, বাবা কখন কোরবানি দিবেন? বাবা বললেন, "আজ কোরবানি দেওয়া বাদ দাও। আজ তো সবাই কোরবানি দিবে। আজ যদি আমরাও কোরবানি দেই তবে তো নিজের বাড়ি, নিজের কোরবানি নিয়ে ব্যস্ত থাকা লাগবে। বাড়ির কোরবানি কখন শেষ হবে আর আত্মীয়, প্রতিবেশীদের বাড়িতে কখন যাবে। কোরবানিতো তিন দিন ধরেই দেওয়া যায়। তাই আজই দিতে হবে এমন কোন কথা নেই।"
বাবার আইডিয়াটা তন্ময়ের ভালোই লাগলো। ঈদের সারাটাদিন তারা তিন ভাই-বোন আত্মীয়, প্রতিবেশী ও বন্ধু বান্ধবদের বাড়িতে মজা করে কাটালো। তাদের কোরবানি দেয়া দেখলো। হাতে হাতে ছোটখাটো কাজ করলো। কোরবানির রান্না করা মাংস খেলো।
ঈদের দ্বিতীয় দিনও তন্ময়ের বাবা বললেন আজও কিছু মানুষ কোরবানি দিবে। অতএব, আজও আমরা কোরবানি দিব না। সবার যখন শেষ হবে তখন আমরা কোরবানি দিব। এবার তন্ময়ের খানিক বিরক্ত লাগলো। কারণ, গতকাল সে তার সব বন্ধু বান্ধবকে দাওয়াত দিয়েছে আজ কোরবানির মাংস খাওয়াবে বলে। অথচ বাবা বলছেন আজও কোরবানি দিবেন না। কাল দিবেন। সে তার বন্ধু বান্ধবকে কি বলবে!! মেজাজ খারাপ লাগতে লাগলো। মন খারাপ করে তিন ভাই-বোন ঘরে বসে রইল। দুপুরের দিকে দাওয়াত খেতে বন্ধু বান্ধবরা এলো। তাদেরকে আগামীকাল দুপুরে খাওয়াবে বলে ফেরত পাঠালো,,,,
এবার ঈদের তৃতীয় দিন। তন্ময়রা দেখলো বাবা ছাগলটি কোরবানি দেওয়ার কোন আয়োজনই করছেন না। তারা ভয়ে ভয়ে বাবার কাছে গিয়ে কখন কোরবানি হবে তা জানতে চাইলো। বাবা বললেন, " আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশি সবার কোরবানিতো শেষ, অতএব এখন আর কোরবানি দিয়ে কি হবে। দরকার নেই কোরবানি দেবার। কোরবানি বাদ"
কি বলছেন বাবা!! লজ্জায় তো পাড়ায় বন্ধু বান্ধবদের কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। কিন্তু বাবা তার সিদ্ধান্তে অনড়। কোরবানি দিবেন না। লজ্জায় তন্ময়রা ঘরের মধ্যে লুকিয়ে রইল। বাড়ির বাইরে গেলো না। দুপুরের দিকে তন্ময়ের কিছু বন্ধু উঁকি ঝুঁকি মেরে তন্ময়ের কাছে এলো, বলল, কিরে ঈদ তো শেষ। তোরা কোরবানি দিবি না!!দাওয়াত দিয়ে ঘরে লুকিয়ে আছিস!! এ আবার কেমন দাওয়াত!!
কি বলবে তন্ময়!! রেগেমেগে বলল, আমাদের কোরবানি আমরা দিব কি দিব না তাতে তোদের কি,,,,,
তোদের বলব কেন,,,,,
আর দাওয়াত দিয়েছি তাতে কি হয়েছে,,,, যাহ, তোদের দাওয়াত ফেরত নিলাম,,,
একরকম ঝগড়াই লেগে গেলো।
যাইহোক কোরবানির ছাগলটা তন্ময়দের যত্নে আম পাতা, কাঁঠাল পাতা খেয়েদেয়ে বেশ আরামেই ছিল। বিকালের দিকে একজন লোক এসে ছাগলটিকে তন্ময়দের বাড়ি থেকে নিয়ে গেলো,,,,
আসলে গত বছর হেলাল সাহেব কোরবানি দিতে পারেন নাই। বাচ্চাদের খুবই মন খারাপ ছিল। তাই এবার আর তিনি বাচ্চাদের মন খারাপ দেখতে চাননি। তাই পরিচিত একজনের কাছ থেকে বাকিতে ছাগলটি এনেছিলেন। ভেবেছিলেন কোন না কোনভাবে টাকা ম্যানেজ করতে পারবেন। কিন্তু তিনি টাকা ম্যানেজ করতে পারেন নাই। তাই শেষ পর্যন্ত আর ছাগলটি কোরবানি দেওয়াও সম্ভব হলো না। ফেরত দিতে বাধ্য হলেন।
গল্পটি খুবই সাধারণ জীবনের। একটা টানাপোড়েন সংসারের। কিন্তু এটাই বাস্তবতা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন