"আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের রিলেশনশীপ এর পথচলার ১৬ তম ঘন্টা অতিবাহিত হলো, দোয়া চাই"- কিছুদিন আগে ফেসবুকে নতুন জেনারেশনের একজনের দেওয়া উপরের হেডিংটা দেখে খুব হেসেছিলাম আর ভাবছিলাম- রিলেশনশীপ আর ব্রেকাপ বিষয়টিকে টেনে নীচেয় নামাতে নামাতে এই জেনারেশন কোথায় দাঁড় করিয়েছে!!!
কিন্তু বাস্তবতা যে কল্পনা এবং চিন্তার চেয়েও অতি রূঢ়, ভয়ঙ্কর, কুৎসিত, হাস্যকর ও লজ্জার হতে পারে- সেই লজ্জাজনক গল্পটা আজ বলছি-
রাত তিনটা। কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর শহরের নিজ বাড়িতে জামাল উদ্দীন ঘুমিয়ে আছেন। তার মোবাইল ফোন বেজে উঠলো। ঘুম ঘুম চোখে তিনি ফোন ধরলেন। বেশ কিছুক্ষণ পর বুঝতে পারলেন যে, তার একমাত্র ছেলের প্রিয় বন্ধু ঢাকা থেকে ফোন করেছে, এত রাতে! ছেলের বন্ধু জানালো- রামপুরা থানার পুলিশ তার ছেলেকে নারী নির্যাতন মামলায় এরেস্ট করেছে। খবরটা শোনার পর জামাল উদ্দীনের মাথা ঘুরতে লাগলো। কি খবর সে শুনলো!! তার ছেলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানে মাস্টার্স পড়তেছে। সেই ছেলে কোন্ নারীকে নির্যাতন করলো? কেন করলো? কি ধরনের নির্যাতন করলো? কিছুই বুঝতে পারছেন না জামাল উদ্দীন। তার মাথা ঘুরতেছে।
ভোরেই কুষ্টিয়া থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলেন তিনি। জামাল উদ্দীন ঢাকা পৌঁছুনোর আগেই তার ছেলেকে পুলিশ কেরানীগঞ্জ জেলখানায় নিয়ে গেছে। বহু কষ্টে কেরানীগঞ্জ জেলখানাতে যেয়েই তিনি ছেলের সাথে দেখা করলেন মামলা সম্পর্কে বিস্তারিত জানবার জন্য। ছেলের কাছে যা জানলেন, তাতে জামাল উদ্দীনের মনে হলো- তার পায়ের নীচের মাটি সরে গেছে।
ঘটনাটা হলো- জামাল উদ্দীনের ছেলে আরিয়ান গত ১ মাস আগে কাউকে না জানিয়ে প্রেমের আধিক্যে হুট করে নিজের ফেসবুক ফ্রেন্ড তাবাসসুম নামের একটি মেয়েকে বিয়ে করে ফেলেছে। বিয়ের পর আরিয়ান বুঝতে পারে যে, তাবাসসুমের অনেক ছেলেবন্ধু রয়েছে, যাদের মধ্যে আরিয়ানও একজন ছিলো। এই বিষয়টা নিয়ে আরিয়ান এবং তাবাসসুমের মধ্যে প্রায়ই ঝগড়াঝাটি হতো এবং এক পর্যায়ে মারামারিও হয়। আর এই ঘটনার জের ধরেই তাবাসসুম থানায় গিয়ে আরিয়ানের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১১(গ) ধারায় যৌতুকের জন্য মারপিট করেছে মর্মে মামলা করে বসে, যা আরিয়ানা জানতোই না। পুলিশ এসে এরেস্ট করবার পর বিষয়টি সে বুঝতে পারে।
ঘটনাগুলো হজম করতে জামাল উদ্দীনের দুইদিন সময় লাগলো। এরপর তিনি ছেলের জন্য জামিনের ব্যবস্থা করতে ছুটাছুটি শুরু করলেন। জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা। জামিন পেতে কিছুটা সময় লাগবে বলে উকিল সাহেব জানিয়েছেন।
যাইহোক, আজ আরিয়ানের হাজতবাসের ১৫ তম দিনে তাকে PW মূলে কোর্টে আনা হয়েছে এবং জামিনের আবেদন করা হয়েছে। উকিল সাহেব ডায়াসে দাঁড়িয়ে জামিন শুনানি করছেন। কোর্টের মধ্যে একপাশে ছোট্ট লোহার গারদে হাতকড়া পরা অবস্থায় আরিয়ানকে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে। আরেকপাশে সাক্ষীর ডকে দাঁড়িয়ে আছে আরিয়ানের নববিবাহিতা বৌ তাবাসসুম। তাবাসসুম ও তার নিযুক্ত বিজ্ঞ উকিল সাহেব কঠিন ও জোরালো ভাষায় জামিনের বিরোধিতা করলেন। উভয়পক্ষের বক্তব্য শুনবার পর বিজ্ঞ বিচারক মহোদয় সন্তুষ্ট হয়ে আসামির জামিনের আবেদন নামঞ্জুর করেন।
জামাল উদ্দীন এখন ছেলের জামিন না হওয়া নিয়ে ভাবছেন না, তিনি অবাক চোখে তাবাসসুমকে দেখছেন! এজলাস রুমে জামাল উদ্দীনের কাছ থেকে মাত্র তিন হাত দূরে ডকে দাঁড়ানো এই মেয়েটি নাকি তার পুত্রবধু! তিনি এমনই হতভাগ্য শশুর যে- যার সাথে তার পুত্রবধুর প্রথম দর্শন হলো কোর্টের কাঠগড়ায়! তার ছেলে নাকি ভালবেসে মাত্র একমাস আগে এই মেয়েটিকে লুকিয়ে বিয়ে করেছিল,,,! হায় রে প্রেম,,,
এ কেমন প্রেম! কেমন ভালোবাসা! কেমন বিয়ে! মাত্র একমাসের মধ্যেই সেই প্রেম, সেই ভালোবাসা, সেই বিয়ে এক ঠেলায় কোর্টবারান্দায় কত কদর্য রূপ ধারণ করে চলে এলো!
জামিনের আবেদন নামঞ্জুর হবার কথা শুনেই আরিয়ান ভেঙে পড়লো। আরিয়ানের গারদের কাছে এসে জামাল উদ্দীন বললেন, "বাবা রে, তোমার এত্তো ভালোবাসার বৌ, যাকে তুমি নিজ দায়িত্বে একা একাই বিয়ে করেছো, বিয়ের কথা বাবা-মাকে পর্যন্ত জানানোর প্রয়োজন মনে করো নাই, সময় পাও নাই, আমার আদরের ছেলের আরো অতি আদরের বৌ সে; আর সেই পরম মমতার গৃহলক্ষ্মীকে আমি কিনা প্রথম দেখলাম কোর্টের কাঠগড়ায় আমার কঠিন প্রতিপক্ষ হিসাবে!! আর যাই হোক, পুত্রবধু তো। আমি কি সাক্ষীর ডকের নীচে দাঁড়িয়ে থাকা ঐ যে আমার একমাত্র পুত্রবধুকে আশীর্বাদ করে আসবো,,!!
তোমার বিয়ের বয়স মাত্র এক মাস; তার উপর তোমার এত্তো দামী শখের বৌ! আগে শুনতাম শখের তোলা নাকি আশি টাকা! তো, এতো তাড়াতাড়ি ছাড়া পেতে চাও কেন! তোমাকে তো আরো কিছুদিন জেলে থাকতেই হবে বাপ! মন খারাপ করো না,,, পেটে যখন খেয়েছো, তখন দেখো পিঠে এমনিতেই সয়ে যাবে,,,, ,"
সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্যবশত আমি ও শীপু এই মামলায় আসামি পক্ষের আইনজীবী। এই মামলার বাদী ও আসামী দুজনেরই কর্মকান্ড দেখে বর্তমান জেনারেশনের ছেলে-মেয়েদের রিলেশনশীপ বা প্রেমের আয়ু ঘন্টা হিসাবে ক্ষণগণনা বাদ দিয়ে আরো মডার্ন ভাষায় তাদের রোমাঞ্চকর বিবাহিত সময় কত ঘন্টা পার হচ্ছে- তা গণনা করে ফেসবুকে পোস্ট দেবার কলিকাল উপস্থিত হয়েছে বলে ভ্রম হচ্ছে না তো আমার,,,,,!!!
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন