শনিবার, ৩০ এপ্রিল, ২০২২

মানুষের চাওয়া বড়ই অদ্ভুত!!

রাকিব সাহেবের স্ত্রী মারা গেছেন বছর দুয়েক আগে। তবে তিনি একা নন। তার পাশে আছে পুত্র, পুত্র বধু, কন্যা, জামাতা, নাতি-পুতি সবাই। রাকিব সাহেবদের সাত পুরুষের স্থায়ী ঠিকানা ঢাকার পুরানো পল্টনে। পৈত্রিক সম্পদের অংশ হিসাবে রাকিব সাহেব পেয়েছিলেন এক দাগে সাত কাঠা জমি। সেখানে তিনি নির্মাণ করেছেন বিশাল দশ তলা ভবন। ভবনটির নাম দিয়েছেন "মায়া"। ভবনটিতে আছে অতি আধুনিক সাজে সজ্জিত  সুবিশাল ত্রিশটি ফ্ল্যাট। নিজ হাতে পৈত্রিক সম্পদের উপর নির্মিত এই "মায়া" নামক ভবনটিকে নিজ সন্তানের মতোই ভালোবাসেন রাকিব সাহেব। অবশ্য "মায়া" ভবনটি ছাড়াও রাকিব সাহেব নিজ উপার্জনে পল্টন এলাকাতেই তিন কাঠা জমির উপর "আলো" নামে আরো একটা ছয় তলা ভবন নির্মাণ করেছেন। আলো ভবনটিতে আছে ১২ টি ফ্ল্যাট। 

ভাগ্য যেমন রাকিব সাহেবকে অর্থ-সম্পদ দু হাত ভরে দিয়েছে, তেমনি সন্তান-সন্ততিও দু হাত ভরে দিয়েছে।  ছয় কন্যা ও এক পুত্রের গর্বিত পিতা তিনি। ছয় কন্যা বড় ও পুত্রটি ছোট। সব মেয়েরই ভালো বিয়ে হয়েছে। সুখে আছে মেয়েরা। আর তার একমাত্র পুত্র ইঞ্জিনিয়র। ভালো চাকরি করে। পুত্রেরও সংসার হয়েছে। ঘর আলো করে এসেছে এক বছর বয়সী নাতি "সাদমান"। সাদমানকে নিয়েই রাকিব সাহেবের দিন কেটে যায়।

রাকিব সাহেবের বয়স ৬৫ বছর।  হার্টে খানিকটা সমস্যা আছে। ট্রিটমেন্ট চলছে। তবে রাকিব সাহেব বয়স ও শরীরের কথা চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নিজ জীবদ্দশাতেই তিনি তার সম্পদ সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দিবেন। রাকিব সাহেব চান না- তার পূর্বপরুষদের থেকে পাওয়া এই সম্পদ "মায়া" ভবনটির ভেতর মেয়েরা ঢুকুক। এই চিন্তা থেকেই তিনি তার সব সন্তান ও নিকট আত্মীয়দের নিয়ে একটি ঘরোয়া মিটিংয়ে বসেন। সেখানে তিনি জানান পৈত্রিক সম্পদের অংশ হিসাবে পাওয়া এই  "মায়া" ভবনটি তিনি সম্পূর্ণ দিতে চান তার একমাত্র পুত্রকে। আর "আলো" ভবনটি দিতে চান ছয় কন্যাদেরকে। এই সিদ্ধান্তে যদিও মেয়েরা ভাগে কম পায়, তারপরও বাবার আবেগের জায়গাকে প্রাধান্য দিয়ে এবং ছোট ভাইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকে সব মেয়েই রাকিব সাহেবের এই প্রস্তাব  মেনে নেয়। এই প্রস্তাবের ধারাবাহিকতায় রাকিব সাহেব "মায়া" ভবনটি পুত্রের নামে এবং "আলো" ভবনটি মেয়েদের নামে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে দেন।

সব ঠিকঠাকই ছিল। রাকিব সাহেবের নাতি  সাদমানও একটু বড় হয়েছে।  সে গোটা দিন দাদাভাই এর সাথে খেলা করে। রাকিব সাহেব সুখি একজন মানুষ। কিন্তু ভাগ্য মনে হয় এতো সুখ মেনে নিতে চাইলো না। তাইতো রোড এক্সিডেন্টে মারা গেলো রাকিব সাহেবের সবে ধন নীলমণি একমাত্র পুত্র সন্তানটি। 

পুরো পরিবার শোকে দিশেহারা। রাকিব সাহেব তাকাতে পারছেন না সদ্য বিধবা হওয়া পুত্রবধুর দিকে। তাকাতে পারছেন না সদ্য এতিম হওয়া নাতির দিকে। এরপরও বেঁচে থাকতে হয়, তাই বেঁচে থাকা। এরপরও লৌকিকতা করতে হয়, তাই কুলখানির আয়োজন করা।

চার দিন পর কুলখানির অনুষ্ঠান শেষে আত্মীয়- স্বজনরা একে একে বিদায় নিলেন। একপর্যায়ে পুত্র বধুর মা অর্থাৎ রাকিব সাহেবের বেয়ান এসে বললেন, " চারিদিকে জামাইয়ের স্মৃতি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।  এই ঘর-সংসারে থাকলে তার মেয়ে স্বামীর স্মৃতি দেখে দেখে পাগল হয়ে যাবে। মেয়ের দ্রুত  সুস্থ ও স্বাভাবিক হওয়া প্রয়োজন নাতি সাদমানকে মানুষ করার জন্য। তাই তিনি তার মেয়েকে নিজের বাড়িতে নিয়ে যেতে চান।" রাকিব সাহেবও অল্পবয়সী পুত্র বধুর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে পুত্র বধুকে মায়ের বাড়িতে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।

প্রায় ছয় মাস হলো রাকিব সাহেবের পুত্র মারা গেছে। পুত্রবধু ও নাতি সাদমান পারমানেন্টলি নানাবাড়িতে থাকছে। মাসে দু-একবার অবশ্য তারা রাকিব সাহেবকে দেখতে আসে। কিন্তু থাকে না। এরইমধ্যে রাকিব সাহেবের মাথায় একটা দুশ্চিন্তা ঘুরছে। কমবয়সী বিধবা পুত্রবধু। কতদিন আর একলা থাকবে!! বেয়ান দেখেশুনে নিশ্চয় তাকে আবার বিয়ে দিবে। বাতাসে তিনি অবশ্য তেমন ইঙ্গিতও পেয়েছেন। তখন তার এই "মায়া" ভবনটির কি হবে। "মায়া" ভবনটি তো তিনি তার পুত্রকে রেজিস্ট্রি করে দিয়ে দিয়েছিলেন। সেই হিসাবে নাতি সাদমান ও তার মা ২৫ টি ফ্ল্যাটের মালিক। সাদমান যেহেতু শিশু তাই অভিভাবক তার মাই হবেন। মায়ের বিয়ে হবে!! অর্থাৎ ভবনটি এমন লোকের হাতে চলে যাবে যে রাকিব সাহেবের রক্তের কেউ নয়!! মাথা ঘুরতে লাগলো তার।  তিনি বুঝতে পারছেন; পুত্রের সাথে সাথে তিনি পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া এই সম্পদটিও হারালেন। 

আইনজীবীর সাথে পরামর্শ করে আজ রাকিব সাহেব কোর্টের বারান্দায়। পূর্বপুরুষদের থেকে পাওয়া এই সম্পদটিতে যেন মেয়ে-জামাইরা ঢুকতে না পারে - এই চিন্তা থেকে একদিন তিনি মেয়েদের বঞ্চিত করে পুত্রকে যে সম্পদ রেজিষ্ট্রি করে দিয়ে দিয়েছিলেন; আজ কোর্টে এসে তিনিই বলছেন; তিনি ভুল করে সম্পূর্ণ সম্পদটি পুত্রকে দিয়েছিলেন। তিনি মেয়েদের বঞ্চিত করতে চান না। তাই দলিল সংশোধনের জন্য আবেদন করেছেন।

আর এই অসম্ভব কাজটি করার জন্য তাকে যতদূর যেতে হয়, তিনি যাবেন,,,,,,,

রাকিব সাহেবকে খুব ভালো করে অনেক্ক্ষণ ধরে  দেখছি আর ভাবছি- মনুষ্য প্রবৃত্তি বড়ই অদ্ভুত!! বড়ই অদ্ভুত!! বড়ই অদ্ভুত,,,,!!!  কি যে সে চায়- তা হয়তো সে নিজেই জানে না,,,!!

কোন মন্তব্য নেই:

Haha

মুভি রিভিউঃ "৯৬"

  "৯৬" সিনেমাটি দেখার পর মুভি রিভিউ দেয়ার জন্য হাত নিশপিশ করছিল। তাই রিভিউ না দিয়ে পারলাম না,,,, মুভি রিভিউঃ "৯৬"  (...