এমন এক সময় আমাদের মধ্যে ঈদ উপস্থিত হলো, যখন গোটা বিশ্ব করোনা ভাইরাসের দুর্বিষহ পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে ও মৃত্যুর মিছিল ঠেকাতে দিশেহারা। করোনার টিকা মানব শরীরে বাস্তবে কতটুকু কার্যকর- তা পর্যবেক্ষণের রেজাল্ট নিয়ে টালমাটাল। একই সাথে বাংলাদেশও করোনার আঘাতে ক্ষত-বিক্ষত, ভীত ও জর্জরিত।
গত বছর লকডাউন থেকে আজ পর্যন্ত বহু মানুষ সর্বহারা হয়েছে। বহু প্রতিষ্ঠান হয়েছে সর্বস্বান্ত। কিছু মানুষের কাছে এটা লকডাউন-লকডাউন ছুটি, মজা করে গ্রামের বাড়ী বেড়াতে যাওয়া। কারো কাছে আরাম। কারো কাছে গজব,,,,,
এমনই পরিস্থিতিতে ঈদ আসতেছে। দেশের দু-চারজন কর্মজীবী মানুষের ঈদের আয়োজন তুলে ধরার চেষ্টা করলাম,,,,
সজল-রুবি আইনজীবী দম্পতি। সব সময় তারা ফিল করেছে কাপল লয়ারের প্রভাব বেশি, প্রসার বেশি, কাজও বেশি। দুজন মিলে যা রোজগার করে, তা মোটামুটি ভালোই। তাদের লাইফ স্টাইলও তুলনামূলক উন্নত। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচও বেশ ব্যয়বহুল। এছাড়া নিকট আত্মীয়-স্বজনরা তাদের কাছ থেকে ঈদের সময় আশা করে থাকে। সামাজিক দায়বদ্ধতাও বেশি। গত বছর দীর্ঘ সময় কোর্ট বন্ধ থাকায় রোজগার বন্ধ হয়ে গেছিলো। তারা বেশ বিপদেই পড়েছিল। সংসার চালাতে অনেক দেনা হয়ে গেছিলো। সেসব কিছুই পরিশোধ হয় নি। এর মধ্যে আবার লকডাউন। আবার কোর্ট বন্ধ,,, অতএব ঈদের বাজার করা গতবারের মত এবারো সম্ভব না। কিন্তু তাদের কন্যা এটা বুঝতে চায় না। কন্যার অন্যান্য কাজিনরা ঈদের কেনাকাটা করেছে। সেও কিনতে চায়। পাচ্ছে না। তাই সে গোমড়া মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে,,,,,
রোকনুজ্জামান এর ৫ টি বাস চলে রাজবাড়ী বেনাপোল রুটে। বাসগুলো ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনা। বিরাট অংকের কিস্তি চলে প্রতি মাসে। এর উপর ৪০ জন কর্মচারী আছে বেতনভুক্ত। গত বছর করোনায় কর্মচারীদের কোন রকমে পেট চালাতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এবার এক কেজি চাল কেনার পয়সাও দিতে পারেনি কাউকে। তার উপর ঈদ। নিজের সংসারেই বেহাল দশা,,,,
কাওসার সাহেব সরকারি কলেজের বাংলার লেকচারার। গত বছর থেকে কলেজ বন্ধ তাই উনারও ছুটি। নিয়মিত বেতন, বোনস, ইনক্রিমেন্ট সবই হচ্ছে। ভালোই আছেন। সবসময় বাসাতেই থাকেন। বেলা করে ঘুম থেকে উঠেন। একঘেয়ে ভাব কাটাতে মাঝে মাঝে ইউটিউব দেখে রান্না করেন আর ফেসবুকে দেন। করোনায় কর্মহীন সহোদর ভাইদের চোখে লাগবে তাই ইচ্ছে মতো ঈদের কেনাকাটা করতে পারছেন না,,,,,
রাফিনা একজন সিঙ্গেল মাদার। সে একটা জাপানিজ সুইটস কোম্পানিতে কাজ করতো। গত বছর করোনার সময় থেকে তাদের কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে। এরপর থেকেই সে বেকার। জমানো সব কয়টা টাকা শেষ। যে কয়জন আত্মীয়ের কাছ থেকে ধার নেয়া যায়- তাও নেয়া হয়ে গেছে। আহারে, গতবার ঈদেও সে তার ছেলেকে একটা নতুন জামা দিতে পারেনি। আর এবার তো,,,,,,,,,,
সিমলা তার বরের সাথে প্রতিবছর এই সময়টা ব্যাঙ্কক, দুবাইতে ঈদের কেনাকাটা করতে যায়। কমসেকম ইন্ডিয়াতে যায় শপিংয়ে। গত বছরও লকডাউন ছিল, আবার এবারও। দেশের বাইরে যাওয়া হচ্ছে না!!! এইভাবে কি ঈদের বাজার হয়!!!!!
ফজলু হাসপাতালের একজন ওয়ার্ড বয়। গত বছর করোনার সময় থেকে তার বেশ গুরুত্ব বেড়েছে। সাথে বেড়েছে আয় রোজগারও। করোনা আক্রান্ত রুগির সাথে আত্মীয় স্বজন প্রায়ই থাকে না। তাদের পয় পরিষ্কার ও অন্যান্য কাজগুলো করার জন্য স্বজনরা ফজলুকে টাকা পয়সা দেয়। টাকা পয়সা না দিলেও সে কাউকে অবহেলা করে না। টাকা দিক আর না দিক এই দূর্যোগে মানুষের তো সেবা করতেই হবে!! এখন তো মহা বিপদের সময়!! রুগীর চাপে গত বছর ঈদের সময় সে হাসপাতালে ছিল আর এবারের অবস্থা তো আরো খারাপ,,,,
জব্বার কৃষক বরাবরের মতোই এবারো পেঁয়াজের চাষ করেছে। দেশে নাকি করুনা ভাইরাস আইছে, তাই লকডাউন।!!!! করুনা আবার কি? এইডা খায় না মাথায় দেয়!!!! দেশ গ্রামে করুনা-টরুনা নেই। পেঁয়াজ বেচুম আর ঈদের জন্যি সেমাই, গোসত কিনুম। লকডাউন? তাতে আমার কি?
সেলিম পুলিশ এই করোনায় রাজারবাগ ২ নং গেটে প্রতিদিন ডিউটি করে টানা বারো ঘন্টা। খুবই এ্যটেনশান থাকতে হয় সবসময়। যদিও পুলিশ হাসপাতালে করোনা রোগীর উপচে পড়া ভীড়। একটা সিটও খালি নাই।গত বছর করোনায় রাজারবাগের পুলিশের আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মারাত্মক বেশি। যাতে এই বছর গতবারের মতো আক্রান্ত না হয় তাই অনেক সিস্টেমের মধ্যে চলছে তারা। গত বছরও দুটো ঈদের একটাতেও ছুটি পায় নি এবং এবারও পাবে না। বৃদ্ধ মা ও নিজ বাচ্চাদের সাথে আবার কবে ঈদ করতে পারবে- তা আল্লাহই জানেন,,,,
মনিরুজ্জামান মুগদাতে একটা সম্পূর্ণ দোতলা বাড়ি ভাড়া নিয়ে কিন্ডারগার্টেন স্কুল চালাতেন। গত বছর করোনার সময় থেকে স্কুল বন্ধ। কয়েক মাস টেনে নেওয়া পর আর সম্ভব হয়নি। স্কুলটা ছেড়ে দিয়েছে। অনেক টাকা লোন হয়ে গেছে। ভেবেছিল এবার মার্চে স্কুল খুললে আবারও যে কোন মূল্যে নতুন করে শুরু করবে,,,,,কিন্তু কিছুই হলো না,,,,জীবনই যেখানে থেমে গেছে, সেখানে তার ঈদের কেনাকাটা কোত্থেকে আসবে!!!!
এখানে করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত দু-চারজন মানুষের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করলাম,,,,
নিন্ম আয়ের দেশ বাংলাদেশ। দেশের বিদ্যমান এই ক্রান্তিলগ্নে ঈদের কেনাকাটা, ঈদের আনন্দ গুটি কয়েক মানুষ ছাড়া ৯০℅ মানুষের কাছেই পীড়াদায়ক। বেশির ভাগেরই পেট চলছে না। সেখানে ঈদের নতুন জামা কেনা বা ফিরনি-সেমাই রান্না করা অসম্ভব। বিত্তবানেরা যদি তাদের সাহায্যের হাত অল্প একটু প্রসারিত করে, তাহলে করোনার এই ভয়াল আগ্রাসনের মধ্যেও ঈদ আনন্দ কিছুটা হলেও পৌঁছে যাবে নিরন্ন, অসহায় ও দুস্থ শ্রমজীবী মানুষের অন্তরে,,,,,,

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন