মঙ্গলবার, ১১ মে, ২০২১

ফেলে আসা রঙিন ঈদ,,

ফেলে আসা রঙিন ঈদ,,


রোজার ঈদের কেনাকাটার জন্য বাজেট পাওয়া, এর মধ্যে আবার বাপের বাড়ির লোকের বাজেট বরাদ্দ হওয়া, কোন্ কোন্ মার্কেটে গেলাম, কার কার জন্য কিনলাম, কি কি কিনলাম, আবার আমার বাচ্চাদের কে কে গিফট করলো, মোট কয়টা ড্রেস হলো, সেই সব কেনাকাটা ও গিফটের ছবি ফেসবুকে দেওয়া, এছাড়া কি কি রান্না হবে; চাইনিজ হবে, না দেশী আইটেম, ঈদের দিন কী কী করব, কই কই আড্ডা বসাবে বন্ধু বান্ধবেরা- তার ডিটেইলস জানা; এগুলোই হচ্ছে বর্তমানে আমার ঈদের প্রস্তুতি,,,

ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছর এইসব কর্মকাণ্ডই করে থাকি। তবে শৈশবের ফেলে আসা ঈদের রঙিন দিনগুলোর মতো চমকপ্রদ আনন্দ নেই যেন এখনকার কিছুতেই। এখন সবকিছু কেমন যেন  পানসে, একঘেয়ে, লোক দেখানো মনে হয়।

গতিশীল পৃথিবীর দুরন্ত গতির ঘূর্ণনে বাড়ছে বয়স, হারিয়ে গেছে শৈশবের দুরন্তপনা, সাথে হারাচ্ছে ঈদ আনন্দ,,,,

ছেলেবেলায় সব থেকে আনন্দের দিন ছিল বছর ঘুরে আসা দুইটা ঈদ। তবে কোরবানির ঈদ অপেক্ষা রোজার ঈদ বা ঈদুল ফিতরে ছিল তুলনামূলক অনেক অনেক বেশি আনন্দ। কারণ সেখানে থাকতো আমাদের নতুন জামা-জুতা পাওয়ার আনন্দ। দীর্ঘ একমাস রোজা রাখার কঠিন পরীক্ষার পর ঈদের প্রতীক্ষা। চাঁদ দেখা না দেখার ওপর অনিশ্চয়তা। দুশ্চিন্তা ও আনন্দ মিশে থাকত। উনত্রিশ রোজার দিন বিকাল থেকে মাগরিব পর্যন্ত চেষ্টা চালাতাম চাঁদ দেখার। সবাই মিলে একদৃষ্টিতে পশ্চিম আকাশে চেয়ে থাকতাম চিকন কাঁচির মতো চাঁদের অপেক্ষায়! মজার ব্যাপার, কোন বারই সফল হইনি। অন্ধকার ঘনিয়ে আসতো কিন্তু আকাশে চাঁদ খুঁজে পেতাম না। সর্বশেষ ভরসাস্থল ছিল বিটিভি। বিটিভিতে কি চাঁদ দেখা গেছে?

তখন অবশ্য বিটিভিতে চাঁদ দেখার ঘোষণা দেওয়ার আগেই বুঝে যেতাম চাঁদ দেখা গিয়েছে কি-না। নারী উপস্থাপিকা যদি মাথার ঘোমটা ফেলে দিয়ে টিভি স্কিনে আসতো, তখনই বুঝতাম কাল ঈদ।

এর পরই টিভিতে বেজে উঠতো  নজরুলের ভুবনজয়ী গান, "ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ"। গানটা যেন ঈদের খুশিকে কয়েক গুন বাড়িয়ে দিত। ফুল সাউন্ড দিয়ে শুনতাম সেই গান। গান শেষ হলেই বিটিভিতে গত ঈদের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান আনন্দমেলা শুরু হয়ে যেত। এর ফাঁকে ফাঁকে বিটিভিতে টানা পাঁচ দিনের ঈদের অনুষ্ঠানের তালিকা দেখানো হতো। পছন্দের  অনুষ্ঠান, সিনেমা ও নাটকের সময়সূচী লিখে রাখতাম। বিশেষ করে সব আকর্ষণের কেন্দ্রে থাকতো হ‌ুমায়ূন আহমেদের নাটক ও হানিফ সংকেতের  ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান "ইত্যাদি"

এর পরপরই শুরু করতাম ঘর গোছগাছ ও পরিষ্কার করা। বসার ঘরের বিছানায় বিছাতাম আলমারিতে তুলে রাখা নতুন চাদর, জানালায় লাগাতাম পর্দা। ফুলদানি বের করে রাখতাম, কারন তাতে ঈদের দিন সকালে রাখবো পাতাবাহার ও আরোও বাহারি সব ফুল,,

সাধারণত ঈদের দিনে রান্নার বাজার আগেই করা হতো। চিনি, পোলাও এর চাল, ডালডা, ঘি, সেমাই, লাচ্ছা, কাজুবাদাম, পেস্তা, জাফরান, কিচমিচ, মসলা ও অন্যান্য সব জিনিসপত্রে ঘরে কেমন একটা সুগন্ধি সুগন্ধি ভাব ছড়িয়ে থাকত।


ঈদের জন্য কেনা জামা-জুতা ও কসমেটিকসগুলো কাউকে দেখাতাম না। দেখালেই পুরাতন হয়ে যাবে- তাই। আলমারি থেকে নতুন জামার প্যাকেট আর বাটা স্যান্ডেলের বিস্কুট কালারের বাক্সটা বের করে দেখে নিতাম। সব ঠিক ঠাক আছে তো! ঈদ না আসা পর্যন্ত প্রতিদিনই নতুন জামার গন্ধ ও ভাঁজগুলো দেখে নেওয়া ছিল রুটিন ওয়ার্ক। নতুন বাটা স্যান্ডেলের গন্ধটা তখন কি যে ভালো লাগতো!! জুতা পায়ে দিয়ে বিছানার উপরও হাঁটতাম। জামাটা নিজের সামনে মেলে ধরে আয়নার সামনে ঘুরে ঘুরে বারবার দেখতাম৷ কিভাবে সাজবো ঠিক করতাম। এরপর নতুন কেনা মেহেদীর টিউব নিয়ে বসতাম সব ভাইবোন। বড়রাও আমাদের কাছে মেহেদী লাগাতে আসতো । মেহেদী ধুয়ার পর দেখা হতো কার রং ও ডিজাইন বেশি  সুন্দর হয়েছে,,, 

সেই রাতে আমি এতটাই উৎফুল্ল থাকতাম যে, চোখে ঘুমই আসতে চাইতো না।

সকালবেলা ঘুম ভাঙত আম্মুর ডাকে ৷ ঘুম থেকে উঠলে আম্মু বলতেন, "ঈদ মোবারক, মামনি। যাও, মুখ ব্রাশ করে একটা খেজুর খাও"। সবকিছু খুব ভালো লাগতো,,

ঘুম থেকে উঠে দেখতাম, আম্মু সেমাই জাতীয় খাবারগুলো রান্নার আয়োজন করছে আর ছোট চাচীআম্মা খিচুড়ি  রান্না করছে। আম্মু আমাকে লম্বা ঝাটার কাঠির মতো মোটা মোটা সেমাই ভেঙে দিতে বলতেন ঘি দিয়ে ভাজবেন বলে। তেল চুপচুপে লাচ্ছা সেমাইয়ের প্যাকেটটা থেকে সুন্দর একটা গন্ধ আসত৷ তখনকার সময় লাচ্ছা সেমাই বলতে শুধুমাত্র আলাউদ্দিনের লাচ্ছা সেমাইই পাওয়া যেত।

দ্রুত ঘর গুছিয়ে ঐ সাত সকালই গোসল সেরে নিতাম। কারণ একটু পরেই টিউবওয়েলের সামনে ছেলেদের সিরিয়াল থাকবে। আমি চান্স পাবো না।

ব্যাস,,,, সাজুগুজু করে, নতুন জামা-জুতা পরে আমি রেডি।


আব্বু ঈদগাহে যাবার আগে হাতের উল্টো পিঠে আতর লাগিয়ে দিত। আমাদের প্রত্যেককে দিত নতুন টাকার নোট। আর  কিছু কিছু বাড়তি পয়সা দিতেন ফকিরকে দান করার  জন্য। অল্প অল্প সেমাই খেয়ে আব্বুর সাথে দুই বোন যেতাম ঈদগাহে।

সেখানে লোকে লোকারণ্য চারপাশ৷ কেমন যেন আতরের গন্ধে পুরো এলাকা মাখামাখি৷ সবার মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও স্নিগ্ধ  পবিত্রতার পরশ৷ ভিক্ষুকের সারি প্রধান সড়কের দুই ধার থেকে শুরু করে ঈদগাহ পর্যন্ত।  ইমাম সাহেব তখন ঈদের তাৎপর্য ও পবিত্রতার গুরুত্ব নিয়ে বয়ান দিতেন৷ আব্বু ও চাচুরা নামাজে বসতেন আর আমরা দুই বোন কাছেই দাঁড়িয়ে থাকতাম। নানারকম খেলনা আর রং-বেরঙের মিষ্টির পশরা দেখতাম। বেলুনতো অবশ্যই কিনতাম ছোট ভাইবোনদের জন্য,, 

নামাজ শুরু হতো। ঈদের নামাজ অন্য নামাজ থেকে খানিক আলাদা।

নামাজ শেষে লম্বা মোনাজাত হতো৷  সবশেষে হতো পরিচিতদের মাঝে কোলাকুলি৷ ঈদগাহ থেকেই আব্বুর সাথে কয়েকজন পড়শী ও আত্মীয়দের বাড়ি গিয়ে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতাম। মজার ব্যাপার ছিল, সব বাড়ি থেকেই কিছু কিছু ঈদ সেলামি পেতাম। সেই সময় ঈদ সেলামি নিয়ে ভাইবোনদের মাঝে একটা কম্পিটিশন হতো। কার কত টাকা হলো- এই আর কি!!


সেই ঈদগাহ, সেই রাস্তা, সেই জনপদ সবই আগের মতোই আছে, শুধু প্রজন্মের টেস্টের পরিবর্তন হয়েছে। সাথে মানুষেরও। পরিবর্তন হয়েছে রুচি ও আন্তরিকতার। পুরোনো মানুষগুলো চলে গিয়ে নতুন মানুষ যোগ হয়েছে৷ এখন আমার দুই ছেলে-মেয়ে তাদের বাবার সাথে ঈদগাহে যায়। নামাজ পড়ে। কোলাকুলি করে। ভাইবোনদের সাথে ঈদের আনন্দ করে। তবে আমাদের মতো উচ্ছ্বাস, প্রতীক্ষা হয়তো থাকে না। তারা একাধিক নতুন ড্রেস পায়। তাই নতুন ড্রেস তেমন আগ্রহ তৈরি করে না। তবে ঈদ সালামি পাওয়ার ব্যাপারটা আমার শৈশবের রঙিন দিনগুলোর মতোই আছে। তারাও বেলুন ও খেলনা কিনে আনে ছোট ভাই-বোনদের জন্য।  এভাবেই চলছে কালের ধারা৷ এভাবেই চলছে ঈদ উৎসব। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে,,,,





কোন মন্তব্য নেই:

Haha

মুভি রিভিউঃ "৯৬"

  "৯৬" সিনেমাটি দেখার পর মুভি রিভিউ দেয়ার জন্য হাত নিশপিশ করছিল। তাই রিভিউ না দিয়ে পারলাম না,,,, মুভি রিভিউঃ "৯৬"  (...