মঙ্গলবার, ২০ এপ্রিল, ২০২১

চ্যালেঞ্জিং বাচ্চার মা আমি,,,,

গ্রীষ্মের ঝাঁঝালো গরম দুপুর।  নুপুর সারা মাসের ঔষধ কিনতে এসেছে। আজকাল ডাক্তার এমন এমন ঔষধ দেয়, যেগুলো সচরাচর সব জায়গাতে পাওয়া যায় না। ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে যেয়ে কয়েকটি দোকান খুঁজে ঔষধগুলো কিনতে হয়। তাতে অবশ্য কিছুটা কম দামেও পায়। আজ ঔষধ কিনে বাসায় ফিরতে বেশ দেরি হয়ে গেছে। বাচ্চাদের গোসলের সময় পার হয়ে গেছে। যদিও জামিলা আছে,,,,, এটাই একটা ভরসা।

মীম ও মুহিবকে জামিলার কাছে রেখেই নুপুর জরুরী প্রয়োজনে বাসা থেকে বের হয়। রশিদের অফিসের পিয়ন ছেলেটি জোগাড় করে দিয়েছে তাকে। বয়স প্রায় ৩০/৩২ বছর। জামিলা নুপুরের বাসায় কাজ করছে গত চার বছর ধরে। জামিলা বাচ্চাদেরকে গোসল করিয়ে দিবে হয়তো। কিন্তু মীম জামিলাকে পছন্দ করে না। এরপর আবার দুষ্ট মুহিব আছে। মুহিবের এবার পাঁচ বছর বয়স হলো। বইখাতা নিয়ে সে বসতেই চায় না।

বাসার নীচতলার সিঁড়ি থেকেই মীমের কান্নাকাটির আওয়াজ পেয়ে নুপুর একরকম দৌড়ে তিন তলায় উঠলো। দরজা খুলেই জামিলা বলল, কাপড় ভরে পায়খানা করেছে কিন্তু ধুইতে দিতেছে না। এদিকে আবার সাহেবের আয়োনের টাইম হইছে। এই অবস্থা দেখলি রাগারাগি করবো। তাই ধোয়নের লাইগা বাথরুমে নিছি আর চিৎকুর পারা ধরছে,,,,

নুপুর হাতের জিনিস পত্র কোনরকম রেখে বাথরুমে ঢুকে দেখে মীম সম্পূর্ণ ভিজা অবস্থায় হাত-পা ছড়িয়ে বাথরুমের ফ্লোরে বসে আছে আর একরকম গোঙরাচ্ছে। ওর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু করতে গেলেই চিৎকার চেচামেচি করে। এতে প্রতিবেশীরা অভিযোগ দেয়। সেটা আরেক যন্ত্রণা। মাঝে মাঝে গোঙানির সময় খিচুনি উঠে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। সেটা ভয়ের বিষয়। নুপুরকে দেখে শান্ত হলো মীম। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে মাকে জাপটে ধরার চেষ্টা করলো,,,

কি মিষ্টি হাসি !!!!

এই হাসি দেখার জন্য নুপুর সব কিছু করতে পারে!!!

এই গোলাপ ফুলের মতো ৯ বছরের মেয়েটি নুপুরের আদরের কন্যা। তবে মীম একটা চ্যালেঞ্জিং বেবি। যাকে বলে প্রতিবন্ধী। ইদানিং মীমের ওজন খানিকটা বেড়ে গেছে। নুপুর তাকে একলা সামলাতে পারে না। জামিলা সাহায্য করে।

মীমকে পরিষ্কার করে, গোসল করিয়ে বের করতে যেয়ে নুপুর একদম ভিজে গেছে কিন্তু  মীম মায়ের জামা শক্ত করে ধরে রেখেছে। ছাড়বে না। মূলত তার ক্ষুধা লেগেছে। খাইয়ে দিতে হবে। সে জামিলার হাতে খাবে না। নুপুরকেই খাওয়াতে হবে। এরপর মুহিব ঘুরছে পেছন পেছন। নুপুর জামিলাকে বলল- মুহিবকে খাবার দিতে। জামিলা না থাকলে যে কি অবস্থা হতো!!! ভাগ্যিস জামিলা ছিল,,,

রশিদ আজ দুপুরে খেতে আসেনি। তাই খানিকটা রক্ষা হয়েছে। দুটো বাচ্চাকে নিয়ে নুপুর ভাত খেয়ে একটু ঘুমিয়েছে।মীম একেবারে মাকে জাপটে ধরে ঘুমায়। একপাশ হয়ে একটানা শুয়ে থাকলে নুপুরের পিঠ ব্যথা করে; তাও মুহিবের দিকে ফিরতে দিবে না। রশিদের কাছে যাওয়া নিয়েও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয় তাকে।

মীমকে কোলের মধ্যে নিয়ে নুপুর তার বিবাহিত জীবনের প্রথম দিককার কথা ভাবতে লাগলো,,,,

সে তখন ব্রাক ব্যংকে চাকরী করতো। পারিবারিক ভাবে ডাচ্ বাংলা ব্যংকের সিনিয়র অফিসার রশিদের সাথে  বিয়ে হয় নুপুরের। ১১ বছর হলো তার বিবাহিত জীবন। দুই বছরের মাথায় কোল আলো করে আসে তাদের কন্যা মীম। নুপুর ও রশিদ দুজনেরই গায়ের রং শ্যামলা কিন্তু মীমের গায়ের রং গোলাপের মতো সুন্দর। যাকে বলে দুধে আলতা। স্বামী-স্ত্রীর প্রথম সন্তান মূলত তাদের জীবন্ত খেলনা। সন্তানের ঘুম, জাগা, কান্না, হাসি, বসা, হাঁটা, ডাকতে শেখা সবকিছুই বাবা-মার কাছে আনন্দের খেলা। সন্তান যা করে, তাতেই বাবা-মা রোমাঞ্চিত হয়। মীম এর ক্ষেত্রেও তার বেড়ে উঠার গতি এমনই ছিল। চাকুরীজীবী বাবা-মা। অফিস থেকে ফিরে মীমকে নিয়েই ব্যস্ত থাকে। মীমের ১৮ মাস বয়স হয়ে গেছে, কিন্তু এখনো হাঁটা শিখছে না। নুপুর ডাক্তারের কাছে গেলো। ডাক্তার মীমের জন্মের সময় কোন জটিলতা ছিল কিনা জানতে চাইলো এবং মীমকে দেখে কিছু টেস্ট দিলো।

পরদিন মেডিকেল টেস্ট নিয়ে নুপুররা আবার ডাক্তারের কাছে গেলো। ডাক্তার টেস্টের রেজাল্ট দেখে যা বলল, তাতে ঐ দিন থেকে নুপুরের সুখী জীবনগল্প ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হলো,,,,

ডাক্তার বলল- ফুলের মতো দেখতে মীম হলো একটা চ্যালেঞ্জিং বেবি। মাথা থেকে পা পর্যন্ত তার ডান পাশের নার্ভের ক্ষমতা ২০%। ট্রিটমেন্ট চলবে; তাতে হয়তো কিছুটা উন্নতি হবে। তবে বাবা-মা যেন বাচ্চাকে  প্রচুর সময় দেয়,,,,কথা বলে,,,,

নুপুর অবশ্য এর পর আরো ডাক্তার দেখিয়েছে কিন্তু সব ডাক্তারই মোটামুটি একই কথা বলে। 

রশিদের অমতেই এক রকম জোর করে নুপুর নিজের চাকরিটা ছেড়ে দেয় মেয়েকে সর্বক্ষণ সময় দেবার জন্য। বুয়ার ভরসায় রেখে অফিসে যেতে আর সাহস হয় না নুপুরের। শুধু মনে হতে লাগলো- তার নিজের সর্বক্ষণ উপস্থিতি মেয়ের বেশি দরকার।

যাই হোক, সংসারের আয় অর্ধেক হয়ে গেলো। অথচ মেয়ের জন্য খরচ হতে থাকলো অযাচিত বেশকিছু পয়সা। ধীরে ধীরে রশিদের আচরণও পরিবর্তন হতে থাকলো। অল্পতেই রশিদ রেগে যায়, বিরক্ত হয়, যেন সবকিছুর জন্য  নুপুরই দায়ী। সময় গড়িয়ে মীমের বয়স নয় বছর। এখন অবশ্য সে এঁকেবেঁকে হাঁটে কিন্তু কিছুই ধরতে পারে না, ফেলে দেয়। ইমব্যাল্যান্স চলাফেরা। কথাও বলতে পারে না। ডাক্তার বলেছিল- আরো বাচ্চার সংস্পর্শে এলে হয়তো মীমের কিছুটা উন্নতি হবে। সেই সূত্র ধরেই  রশিদকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে মুহিবের জন্ম।

রশিদের সাথে নুপুরের সম্পর্কটাও স্বার্থের। রশিদ এখন অনেক বড় পদে আছে। তার জীবনযাপন অনেকখানি  বহির্মুখী । প্রথমদিকে মেনে নিতে কষ্ট হয়েছে। ঝগড়াঝাটি। কান্নাকাটি। লাভ হয়নি কিছু। ডিভোর্সের পর্যায়েও পৌছে গেছিলো তাদের সম্পর্কটা। তাতে নুপুরের আরো বিপদ। রশিদ যদি ডিভোর্স নেয় তো নুপুর কি করবে? নুপুরের পয়সা দরকার মীমের চিকিৎসার জন্য, মুহিবকে মানুষ করার জন্য। মীমকে রেখে চাকরি করাও সম্ভব নয়। অতএব রশিদের সব কর্ম মেনে নিয়েই সংসার করছে সে,,,,, কতোদিন দুইজনে কোথাও বেড়াতে যাইনি, কতোদিন বাইরে খেতে যাইনি,,,,,কতো স্বপ্ন নিয়ে সংসার শুরু করেছিল আর ভাগ্যে কি লিখা ছিল!!!!

বাইরে বাতাস বইছে। আকাশ ভরা মেঘ। বৃষ্টি হবে হয়তো!!! সন্ধ্যায় রশিদ দুনিয়ার সব বাজার করে বাসায় ফিরলো। এতো বাজার গুছিয়ে উঠাতেও সময় লাগবে।

রশিদের রুম আলাদা। সে বাচ্চাদের ঝৈ ঝামেলায় বিরক্ত হয়। নিজের রুমেই থাকে। নিজের কাজ করে, ল্যাপটপ চালায়। হঠাৎ হঠাৎ মুহিবের সাথে টিভি দেখে। কোন কিছু লাগলে নুপুরকে ডাকে। রাতের খাবার শেষ করার আগেই ঝড়বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। মীম ভয় পেয়ে চিৎকার করছে। ঝড় উঠলে ডাক পড়ার শব্দে মীম খুব ভয় পায়। জামিলাকে ডাইনিং পরিষ্কার করতে বলে নুপুর তাড়াতাড়ি মীমের কাছে গেলো, ওকে থামাতে হবে, আর তা না হলে রশিদ বিরক্ত হবে। 

থাক চিৎকার করে না। ভয় নাই।  আমি আছি। ভয় নাই। এই তো আমি আছি,,,, মেয়েকে শান্ত করার চেষ্টা করে নুপুর। মুহিবটাও কোলের কাছে এসে বসে। মায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, আমাকেও বল। কথা শুনে হাসে নুপুর। তুইও ভয় পাস!!! তুই তো আমার বীরপুরুষ!!!  আমার বীরপুরুষ নাকি ভয় পায়!!! ভয় পাবার কিছু নেই।  দুইজন দুইপাশে শুয়ে চোখ বন্ধ করো তো। 

মীমের গোঙানি খানিক কমেছে।  সে হয়তো বুঝেছে সত্যি ভয় নেই।  মা আছে,,, 

রশিদ তার রুম থেকে চিৎকার করে কফি চাইলো। হায়রে এখন নুপুর কিভাবে যায়!!!! 

নুপুর জামিলাকে বলল সাহেবের জন্য  কফি বানাও তো। আমাকেও দিও,,

বহুতদিন ছুটা কাজের বুয়া কাজ করেছে।  পারমানেন্ট কেউ টিকতো না। জামিলাটা আছে অনেক দিন। ভাগ্যিস জামিলা আছে,,,,,, 

কুমির আর শিয়ালের গল্প শুনতে শুনতে দুইজন ঘুমালো। 

বাচ্চাদের পাশ থেকে নুপুর আস্তে আস্তে উঠলো যাতে বাচ্চারা না জাগে। কখন কফি চেয়েছি, এখনো দিচ্ছে না কেন?  রশিদের রুমের দিকে গেলো সে। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। নুপুর কিচেনে গেলো। দেখলো তার মগে কফি ঢালা। ঠান্ডা হয়ে গেছে। জামিলা কই!!!!??? পরক্ষণেই বুঝতে পারলো জামিলা কই,,,, মূহুর্তের মধ্যে  মাথাটা ফাঁকা হয়ে গেলো,,,,,কি করবে নুপুর? 

বারান্দায় এসে দাঁড়ালো। ঝড় নেই কিন্তু বৃষ্টি আছে। বৃষ্টির পানিতে চোখ মুখ ভিজে যাচ্ছে,,,,,, 

রশিদ তো তাকেই ডেকেছিল,,,,,হয়তো তাকে প্রয়োজন ছিল!!!! 

মেয়েরও তাকে প্রয়োজন। 

কার প্রয়োজনের গুরুত্ব দিবে সে,,,

কি বলবে সে?? কিছু কি বলার আছে!!! শুধু ভাবছে, ভাগ্যিস জামিলা ছিল,,, 

ঠিকই তো,,,,,ভাগ্যিস জামিলা ছিল,,, 

তাকে মেয়েরই বেশি প্রয়োজন, অনেক প্রয়োজন,,,,,,,,,

ভিজেই যাচ্ছে নুপুর,,,,,,, বৃষ্টির পানি যেন ধুয়ে দিচ্ছে সব ক্লান্তি, লজ্জা, অপমান, কষ্ট,,,,,, শুধু  জাগিয়ে তুলছে মাতৃত্ব আর মাতৃত্ব,,, 


Haha

মুভি রিভিউঃ "৯৬"

  "৯৬" সিনেমাটি দেখার পর মুভি রিভিউ দেয়ার জন্য হাত নিশপিশ করছিল। তাই রিভিউ না দিয়ে পারলাম না,,,, মুভি রিভিউঃ "৯৬"  (...