"বাপের বাড়ি এই গাঁয়ে,
শশুর বাড়ি ঐ,
তবে তোমার বাড়ি কই গো নারী
তোমার বাড়ি কই"
গানটির মধ্যে আমাদের দেশের নারীদের বাস্তব অবস্থা খুবই স্পষ্ট। নারীরা নিজের পায়ে দাঁড়াতে না পারলে এই আইডেন্টিটি ক্রাইসিস থেকে বের হয়ে আসতে পারবে না।
তাই বলছি, মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা খুব বেশি দরকার।
শুধু টাকার জন্য নয়;
নিজের অস্তিত্বের জন্য,
নিজের একটা আলাদা পরিচয়ের জন্য,
মর্যাদার জন্য।
নিজস্ব আকাঙ্খা ও স্বপ্ন পূরণের জন্য।
নিজের পায়ে দাঁড়ানো বলতে কি বুঝিঃ
এক কথায় বলা যায়- আত্মনির্ভরশীলতাই হলো নিজের পায়ে দাঁড়ানো।
নিজের পায়ে দাঁড়ানো, প্রবাদ কথাটি খুবই সাধারণ। কিন্তু দুনিয়াতে এর চেয়ে কষ্টের কাজ দ্বিতীয়টি নেই! নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলে প্রতিষ্ঠিত হবার মূল মন্ত্র হিসেবে কথাটি ব্যবহার করা হয়। মূলত নারীদের জন্য নিজের পায়ে দাঁড়ানো খুবই কঠিনতম পরীক্ষা।
শিশুকাল হতে আমরা একটি মেয়েকে বলি, ভালো করে পড়াশোনা করে ভালো জায়গায় ভর্তি হও; নইলে ভালো বিয়ে হবে না। একটি ছেলেকে বলি, ভালো করে পড়াশোনা করে ভালো চাকরি কর, কারণ তোমাকে সংসার চালাতে হব, বৌ খাওয়াতে হবে। অর্থাৎ ছেলে-মেয়ে উভয়কেই বলা হচ্ছে মেয়েরা উচ্চ শিক্ষিত হবে বিয়ের জন্য, আত্মনির্ভরশীল হবার জন্য নয়। ছেলে সন্তানকে শুরু থেকেই চাপের মধ্যে রেখে শেখানো হয় বড় চাকরি, পদমর্যাদা ও আর্থিক সাফল্যই সুখের চাবিকাঠি। ঠিক একইভাবে মেয়েদের সার্বিক উন্নতির জন্য পরিবারের বড়দের এই শিক্ষাটি তাদের কন্যা সন্তানদেরকেও দেওয়া উচিৎ।
কন্যা সন্তানদের অর্থনৈতিক ভাবে স্বনির্ভর করতে হলে তাদেরকেও নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে উৎসাহিত করতে হবে। তাদের বোঝাতে হবে যে, তাদের জীবনে বিয়েটাই সব নয়, নিজেদের ভবিষ্যৎ গড়ার দিকে মন দিতে হবে তাদেরও।
অবস্থা ও অবস্থানঃ
আমার দুই ভাগ্নি প্রিয়া ও শ্রেয়া। স্রেয়া ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করেছে। তার শিল্পপতির বরের সঙ্গে বিয়ে হয়েছে। সে গাড়িতে-বাড়িতে, সোনাদানা-গহনায় মোড়া আছে। আর প্রিয়া ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে পড়াশোনা করে সোনালী ব্যাংকে খুবই সাধারণ একটা চাকরি করছে। স্রেয়ার আর্থিক অবস্থা ভালো হলেও সামাজিক অবস্থান নেই। অন্যদিকে প্রিয়ার অবস্থা অতটা ভালো না হলেও সামাজিক অবস্থান আছে। এই অবস্থা ও অবস্থান এর পার্থক্য অনেক বেশি।
এ্যসেট ও লাইবিলিটিসঃ
গত দশ বছর যাবৎ আমাদের দেশে প্রতিবছর যে পরিমান ছাত্রছাত্রী মেডিক্যালে চান্স পায় তার মধ্যে ৬০% ছাত্রী আর ৪০% ছাত্র। এই ছাত্রছাত্রীদের মেডিক্যালে পড়াশোনা করাতে পরিবার ও সরকারের অনেক ব্যয় হয়। কিন্তু ৬০% ছাত্রীর মধ্যে অর্ধেকও নিয়মিত পেশাজীবনে প্রবেশ করে না। ভালো ছাত্রী ও মেডিক্যালে পড়ার সুবাদে বেশিরভাগ ছাত্রীদের বিয়ে হয় বড় ঘরে। হিসাব করে দেখেন এই বিশাল মেধাবী ছাত্রীদের হতে দেশের এ্যসেট, লাইবিলিটিস ও মেধার কি পরিমান অপচয় হয়।
এটা তো শুরু মেডিক্যাল এর উদাহরণ দিলাম। ঢাকা ইউনিভার্সিটিসহ অন্যান্য বিদ্যাপীঠ হতে বের হয়ে মেয়েদের কর্মজীবনে আসার গড় হিসাব একেবারে তলানিতে।
তুলনামূলকভাবে অল্পশিক্ষিত মেয়েরা বেশ এগিয়ে আছে। সেটা পরিবেশের চাপেই হোক বা সংসারের দায়েই হোক। গার্মেন্টস থেকে শুরু করে বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান বা কুটির শিল্পে এমনকি বাসাবাড়ির কাজ ও বিদেশী রেমিটেন্স পাঠানোতে তদের ভূমিকা অতুলনীয়।
এবার সুন্দরী একটি মেয়ের গল্প বলি। বেশি সৌন্দর্যের কারণে অল্প বয়সেই খুবই ধনী পরিবারে তার বিয়ে হয়। এক্ষেত্রে তার অ্যাসেট ছিল তার সৌন্দর্য। চল্লিশ বছর বয়সের সময় অ্যাক্সিডেন্টেলি তার ডিভোর্স হয়ে যায়। এই বয়সে তার সেই সৌন্দর্য আর নেই, অর্থাৎ তার এ্যাসেট ফুরিয়ে গেছে। আর এটাই স্বাভাবিক। দীর্ঘ জীবন পর্যাপ্ত সচ্ছলতার মধ্যে কাটিয়ে এখন বিরাট বিপদে আছে সে। কাজেই সৌন্দর্য মুখ্য নয়; নিজেকে গড়ে তোলাই মুখ্য।
মর্যাদা ও আত্মবিশ্বাস সৃষ্টিঃঅর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন নারীর জন্য অত্যন্ত জরুরি। নিজের পায়ে দাঁড়ানো নারী যেমন হয় আত্মবিশ্বাসী, তেমনি পায় মর্যাদা। নিজের উন্নতির পাশাপাশি সে দেশের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে।
কাজেই মেয়েদেরকে বসে থাকলে চলবে না, নিজেদেরও কাজ করতে হবে, লেখাপড়া শিখতে হবে এবং নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে হবে।
দায়িত্ববোধ সৃষ্টিঃ
আমাদের পরিবারের অনেক ছেলে-মেয়েই উপার্জন করে থাকে। ছেলেদের ক্ষেত্রে এটা মনে করে নেওয়ায় হয়ে যে, তারা সংসার খরচে অংশগ্রহণ করবে এবং মেয়েদের বলা হয়ে যে, তারা যেন তাদের উপার্জিত টাকা ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করে রাখে।
বস্তুত সংসার খরচের জন্য কন্যা সন্তানদেরও টাকা দিতে বলা উচিত, যাতে তারাও দায়িত্ব নিতে শেখে। এ ছাড়া সংসারের নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে তাদের মতামতও নেওয়া উচিৎ। কন্যা সন্তানদের যদি বিয়ের আগে থেকেই এটা শেখানো হয়, তাহলে বিয়ের পরে শ্বশুরবাড়ি গিয়ে তারা এই অভ্যাসটাই বজায় রাখবে।
কাজ কিন্তু দাম নাইঃ
অর্থনীতিবিদ আকবর আলী খানের প্রবন্ধে কোন এক গৃহপরিচারিকার প্রেমে পড়ে গৃহকর্তা বিয়ে করে ফেলেন। গৃহকর্ত্রী হয়ে যাওয়াতে মহিলাটি গৃহপরিচারিকার পদটি হারায়। যদিও মহিলাটির কাজ কিন্তু কমেনি, স্ত্রী হওয়ার পরও থালা বাটি মাজা, ঘরদোর গোছানো সব কাজই আছে। কিন্তু আগের কাজের আর্থিক মূল্য ছিল, বর্তমানে গৃহকর্ত্রী হওয়াতে সে বেতন পাচ্ছে না, তাই তার কাজের মূল্য রাষ্ট্রের জিডিপিতে আসছে না। কাজেই বুঝতে পারছেন মহিলাদের কাজের মূল্য কেমন! নিজের পায়ে দাঁড়ানো মহিলা সমাজ, পরিবার, রাষ্ট্রের কাছে মহামূল্যবান।
কর্মজীবী নারীদের নিয়ে একটাই সমস্যা, তা হলো ঘরে থাকা একজন নারীর কাছ থেকে পুরো ২৪ ঘন্টা সময়ই তার উপস্থিতি পাওয়া যেতো কিন্তু কর্মজীবী হওয়াতে এই উপস্থিতির পরিমান ৮/১০ ঘন্টা কমে যাবে।
উন্নত দেশের কর্মজীবী নারীদের কথা বাদই দিলাম আমাদের দেশের কোন উপজাতি মেয়ে পুরুষের ঘাড়ে বসে খায় না। নিজেরা কোন একটা কাজ করে।
তাই ঘরে বসে থেকে বাচ্চা মানুষ করা আর সংসার সামলানোর মানসিকতা থেকে সবার আগে নারীকেই বের হতে হবে। প্রথম যুদ্ধ সমাজ বা সংসারের মানুষের সাথে নয়; প্রথম যুদ্ধ করবে নারী তার নিজের সাথে। নিজের মানসিকতার সাথে। তাহলেই কর্মজীবনে প্রবেশ করার জন্য পদক্ষেপটি সে উঠতে পারবে।
অতএব নিজের, সংসারের, সন্তানের ও দেশে উন্নতির জন্য নারীদের নিজের পায়ে দাঁড়াতেই হবে।
মুনমুন মুখার্জীর আবৃত্তি করা বিখ্যাত "নারী" কবিতা থেকে কয়েকটি লাইন বলে শেষ করছিঃ-
নারী, দু’হাতের শিকল ছিঁডো-় এ হাত তোমার
দু’পায়ে দৌড়ে যাও -এই পা তোমার
দু’চোখে জীবন দেখ-এই চোখ তোমার
এই জীবন তোমার


কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন